ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

কালিগঞ্জে সিন্ডিকেটের থাবায় কৃষকের ৭৫ কোটি টাকা লোপাট


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৮:৪৯ পিএম

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বোরো ধানের বাম্পার ফলনও হাসি ফোটাতে পারছে না কৃষকের মুখে। ঘাম ঝরানো ফসলের ন্যায্য প্রাপ্তি এখন পরিণত হয়েছে এক অদৃশ্য ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিকলে’।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সারের কৃত্রিম সংকট ও ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট চলতি মৌসুমে উপজেলার প্রান্তিক চাষিদের পকেট থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সরকারি দরের চেয়ে সারে অতিরিক্ত ব্যয় এবং ধান বিক্রিতে লোকসান—এই দ্বিমুখী চাপে এখন দিশেহারা কালিগঞ্জের হাজারো কৃষক।

অভিযোগ উঠেছে, এই বিশাল অঙ্কের ‘গণলুটপাটের’ নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন খোদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দীন। তাঁর রহস্যজনক নির্লিপ্ততা এবং সিন্ডিকেট তোষণ কৃষকদের খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

হিসাবের গোলকধাঁধায় লোকসানের চিত্র
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কালিগঞ্জে ৭ হাজার ২৫৮ হেক্টর (প্রায় ৫৪ হাজার ২৫৩ বিঘা) জমিতে ধান চাষ হয়েছে। বিঘাপ্রতি সর্বনিম্ন ২২ মণ (৮৮০ কেজি) ফলন হিসেবে মোট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ৬৪০ কেজি। সরকার নির্ধারিত কেজি প্রতি ৩৬ টাকা দরে যার বাজারমূল্য ১৭১ কোটি ৮৭ লাখ ৩৫ হাজার ৪০ টাকা।

কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃষক প্রতি কেজি ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন মাত্র ২৫-২৬ টাকায়। ফলে কেবল ধান বিক্রি থেকেই কৃষকের লোকসান হয়েছে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ৬৫ হাজার ২২২ টাকা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সারের কৃত্রিম সংকট। বিঘাপ্রতি গড়ে ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত সার খরচ চাপিয়ে কৃষকের পকেট থেকে আরও ২৭ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ডিলাররা। সব মিলিয়ে কালিগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিতে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার এক ভয়াবহ ধস নামানো হয়েছে।

ডিলারদের ‘জিম্মি দশা’ ও কৃষকের আর্তনাদ
উপজেলায় বিএডিসির ও বিসিআইসির ২৪ জন ডিলার এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ৮৫ জন সাব-ডিলারসহ মোট ১০৯ জন ডিলারের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। মথুরেশপুর ইউনিয়নের কৃষক ফরিদ তরফদার আক্ষেপ করে বলেন, "বস্তায় ৪৫০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনেছি। রশিদ চাইলে ডিলার বলে—নিলে লন, না নিলে বিদেয় হন।" একই অভিযোগ ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের আব্দুর রহিমের। তিনি বলেন, "আমরা রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলাই, আর কর্মকর্তারা এসি রুমে বসে সিন্ডিকেটের ভাগ নেন।" কুশুলিয়া ইউনিয়নের নজরুল ইসলাম জানান, তিন বস্তা সারে তাকে ১৫০০ টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ফসলের উৎপাদন খরচে।

মাঠে নেই কৃষি কর্মকর্তা, ক্ষুব্ধ জনপ্রতিনিধি
কৃষকদের অভিযোগ, সারের সরকারি দাম কত বা ধানের রোগবালাই প্রতিকারের উপায় কী-তা জানাতে কোনো কৃষি কর্মকর্তাকে মাঠে পাওয়া যায় না। এই অনুপস্থিতিকে ‘পরিকল্পিত অপরাধ’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "পরিষদের মিটিংয়ে বারবার সারের বাড়তি দাম নিয়ে বললেও কৃষি কর্মকর্তা গুরুত্ব দেন না। তিনি ডিলারদের সাথে গোপন বৈঠক করেন অথচ কৃষকদের কথা শোনেন না।"

উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ডাঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। সারের দাম নিয়ে ডিলার ও কর্মকর্তার বক্তব্যের কোনো মিল নেই। এসব দেখার দায়িত্ব যার, তিনি পুরোপুরি নির্লিপ্ত।

অভিযুক্ত কর্মকর্তার ‘ওপর মহলের’ দাপট
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দীন সাংবাদিকদের সাথে অত্যন্ত রুক্ষ আচরণ করেন। তিনি বলেন, "বাজারে কোনো সংকট নেই, কৃষকরা অতিরঞ্জিত কথা বলছে।" ২০২২ সাল থেকে একই কর্মস্থলে থাকা এই কর্মকর্তা দম্ভোক্তি করে বলেন, "বদলির ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, ওপর মহলে আমার হাত অনেক লম্বা।"

এদিকে সাতক্ষীরা জেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ সাইফুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো সদুত্তর দেননি। তবে তিনি দাবি করেন, কৃষকরা সরকারি দামেই সার কিনছে ও ধান বিক্রি করছে, কোথাও কোনো সমস্যা নেই।

প্রশাসনের নাকের ডগায় চলা এই প্রকাশ্য লুটপাটে কালিগঞ্জের কৃষি অর্থনীতি এখন ধ্বংসের মুখে। কৃষকদের দাবি, অবিলম্বে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তাদের জীবন রক্ষা করা হোক।



এ সম্পর্কিত আরো খবর