অনলাইন রিপোর্টার
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ঘিরে ক্ষমতা দখল, প্রশাসনিক অনিয়ম ও ট্রাস্টি বোর্ড গঠন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রতিষ্ঠিত এই অলাভজনক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ এবং আইনি জটিলতার মুখে রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার পেছনে সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও শিরিন হকের সংশ্লিষ্টতার কথা তিনি উল্লেখ করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ দাবি করেন, ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সাভার সদর দপ্তরে বহিরাগতদের একটি দল প্রবেশ করে তাকে ও আরেক পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চাপের মুখে লিখিত একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হলেও সেটি প্রকৃত পদত্যাগ নয়। তিনি অভিযোগ করেন, এ সময় প্রশাসনের উপস্থিতি থাকলেও তারা কার্যকর কোনো ভূমিকা নেয়নি। এ ঘটনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ দখলের প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নেতৃত্ব ও ট্রাস্ট কাঠামো নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়। এরপর ২০২৫ সালে একটি নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের দলিল তৈরি হয়, যেখানে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ কয়েকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। ট্রাস্ট আইন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছাড়া নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন প্রশ্নবিদ্ধ বলে ডা. নাজিমউদ্দিন অভিযোগ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, বোর্ডে এমন কিছু ব্যক্তিও যুক্ত হয়েছেন যারা অতীতে প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত ছিলেন। পাশাপাশি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভিন্নমত এবং অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। ডা. নাজিমউদ্দিন দাবি করেন, তার অডিট ও দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগের কারণে একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করে।
এদিকে, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে মব পরিস্থিতির বর্ণনা পাওয়া গেছে, যেখানে কয়েকজন কর্মী ও বহিরাগত ব্যক্তির উপস্থিতি ছিল বলে দাবি করা হয়। তবে এসব ঘটনার আইনি সত্যতা এখনো তদন্তাধীন।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অতীত ইতিহাসে দেখা যায়, এটি মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল থেকে উদ্ভূত একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। ছয়জন প্রতিষ্ঠাতার মধ্যে ডা. নাজিমউদ্দিন আহমেদ ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধকালীন চিকিৎসা কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, ট্রাস্টি বোর্ডের বৈধতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক পক্ষ অভিযোগ করছে, পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠান দখল করা হয়েছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কিছু পক্ষ বলছে বিষয়টি আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ।
এ অবস্থায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও আইনি কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি সমাধানে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যাখ্যা প্রয়োজন, যাতে প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ও সেবামূলক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
আকাশজমিন / আরআর