অনলাইন রিপোর্টার
ডিপথেরিয়া কী: ডিপথেরিয়া একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ, যা প্রধানত গলা, নাক ও শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। এই রোগে গলায় ধূসর রঙের একটি আস্তরণ তৈরি হয়, যা শ্বাস নিতে বাধা সৃষ্টি করে। এটি বিষাক্ত টক্সিন তৈরি করে হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতিও করতে পারে। এই রোগ হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সহজেই ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা, ব্যবহৃত জিনিস ব্যবহার বা ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে অবস্থান করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
দেশে হামের ব্যাপক সংক্রমণের মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে আরেকটি প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ ডিপথেরিয়া। প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এ রোগ এখন আবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় শনাক্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি বিপজ্জনক দিকে যাচ্ছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সিলেট, হবিগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচর, কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। রাজধানীর একাধিক হাসপাতালেও এ রোগে আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিয়েছেন। এরই মধ্যে এ রোগে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চলমান হামের পরিস্থিতির মধ্যেই ডিপথেরিয়ার বিস্তার শুরু হলে শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতি এড়াতে এখনই আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
ডিপথেরিয়ার বড় প্রাদুর্ভাব প্রথম দেখা যায় ২০১৭ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। ওই বছরের ৩ নভেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে ১৫ জনের মৃত্যুসহ ৮০৪ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়। প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ১০ নভেম্বর, মেডিসাঁ সাঁ ফ্রঁতিয়ে (এমএসএফ) পরিচালিত একটি ক্লিনিকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের ৭৩ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ বছরের নিচে এবং এর মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী। মারা যাওয়া ১৫ জনের ১৪ জনই শিশু ছিল। সংস্থাটি তখন সতর্ক করে জানায়, ঘনবসতি, অপুষ্টি ও কম টিকাগ্রহণ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলতে পারে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও দেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সার্ভিল্যান্স তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সিলেট ও হবিগঞ্জে, ২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে (আইডিএইচ) এবং ২৫ মার্চ কামরাঙ্গীরচরে ডিপথেরিয়া রোগী শনাক্ত হয়। এছাড়া ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট ও ২৪ সেপ্টেম্বর আইডিএইচে, ২৬ আগস্ট তেজগাঁওয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং ৮ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী শনাক্ত হয়। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রোগীটি কিশোরগঞ্জ থেকে সংক্রমিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজধানীর আরেকটি হাসপাতালে ডিপথেরিয়ার রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এটি সংক্রমণের নীরব বিস্তারের ইঙ্গিত। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডিপথেরিয়ার প্রাথমিক উৎস রোহিঙ্গা ক্যাম্প হলেও পরে তা বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্যও রয়েছে। হাম-পরবর্তী সময়ে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে।
তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ডিপথেরিয়ার বুস্টার ডোজ চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ৬ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুদের লক্ষ করে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালালে দ্রুত ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
ডিপথেরিয়া বা করিনিব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরিয়া একটি গ্রাম-পজিটিভ, মুগুর আকৃতির ব্যাকটেরিয়া, যা অত্যন্ত সংক্রামক ও জীবনঘাতী রোগ সৃষ্টি করে। এটি মূলত গলা, নাক ও শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায় এবং টক্সিন তৈরি করে গলায় ধূসর আস্তরণ সৃষ্টি করে। ফলে শ্বাসকষ্ট, গিলতে সমস্যা এবং হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে। রোগটি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়।
চিকিৎসকদের মতে, ডিপথেরিয়ার প্রধান লক্ষণ হলো গলা ব্যথা, জ্বর, ঘাড়ের গ্রন্থি ফুলে যাওয়া এবং গলায় ধূসর আস্তরণ তৈরি হওয়া। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি, ব্যবহৃত জিনিসপত্র বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে জীবাণু ছড়ায়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির অধীনে ডিপিটি ও পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডিপথেরিয়া নিয়ন্ত্রণে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, অ্যান্টিটক্সিন, অ্যান্টিবায়োটিক এবং জরুরি টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের সুপারিশ করেছে। সংস্থাটি বিশেষ করে শিশু, স্বাস্থ্যকর্মী এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ডিপথেরিয়া অত্যন্ত ভয়াবহ সংক্রামক রোগ। এর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় অ্যান্টিটক্সিন ও ওষুধ এখন সহজলভ্য নয়। ফলে রোগী এলে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে হাসপাতালে ভিড়ের কারণে অন্য রোগীদের সেবা ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে হামের পর দেশ নতুন আরেকটি স্বাস্থ্য সংকটে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, ডিপথেরিয়ার বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত এবং করণীয় নিয়ে সরকার কাজ করছে।
আকাশজমিন / আরআর