সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বেত্রাবতী নদীর কোল ঘেঁষে অবস্থিত মনোরম ও শান্ত গ্রাম মুরারিকাটি। বছরের অন্য সময় গ্রামটি নিঝুম থাকলেও বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার এলেই এর রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। গ্রামের জেলেপাড়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয় চার দিনব্যাপী এক মহোৎসব, যা শত বছরের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ “তাল মেলা” নামে পরিচিত। এটি মূলত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন হলেও সময়ের ব্যবধানে এটি পরিণত হয়েছে সম্প্রীতি ও মিলনমেলার এক অনন্য উৎসবে।
স্থানীয়দের মতে, পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার এই মেলার সূচনা হয়ে আসছে। জেলেপাড়ার মানুষরা সারা বছরের ক্লান্তি ভুলে এই উৎসবে মেতে ওঠেন। মেলায় কলারোয়া উপজেলা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজনরাও এ সময় গ্রামে ফিরে আসেন।
মেলার মূল প্রাঙ্গণ ও আশপাশ এলাকায় তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি উৎসবের আবহে মুখরিত হয়ে ওঠে। মেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো বাহারি মিষ্টির পসরা। ভাজা জিলিপি, ছানার মিষ্টি, রসগোল্লা, বালুশাই, গজা, চমচম, সন্দেশ ও কলারোয়ার বিখ্যাত দইয়ের সুবাসে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে। অভিজ্ঞ কারিগররা বছরের পর বছর ধরে এসব মিষ্টি তৈরি করে আসছেন।
শিশুদের জন্য কদমা, বাতাসা ও মুড়িমুড়কির স্তূপ মেলাকে রঙিন করে তোলে। একই সঙ্গে মৌসুমি ফলের সমারোহও চোখে পড়ে। মাঠজুড়ে বসে তালের শাঁসের দোকান, যেখানে কচি তালের শাঁসের জন্য দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়। এছাড়া লিচু, হিমসাগর ও গোবিন্দভোগ আম এবং পাকা কলার সুবাসে পুরো এলাকা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
রোদ থেকে বাঁচতে মেলায় আগতদের হাতে দেখা যায় নকশা করা তালপাতার পাখা, যা স্থানীয় কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি। আধুনিকতার যুগেও এই হস্তশিল্পের কদর এখনও অটুট রয়েছে।
মেলায় শিশুদের জন্য রয়েছে কাঠের তৈরি রাইড, কাপড়ের মঞ্চ এবং ছোটখাটো বিনোদনের নানা আয়োজন। রঙিন মাটির ঘোড়া, হাতি, বাঁশি এবং জাদুর খেলা শিশুদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে। দিনভর হাসি-আনন্দে মুখর থাকে পুরো মেলা প্রাঙ্গণ।
রাত নামলে মেলার পরিবেশ আরও বদলে যায়। ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা, কবিগান ও লোকজ কাহিনী পরিবেশিত হয়, যেখানে বীরত্ব, ভক্তি ও সাম্যের বার্তা ফুটে ওঠে। এসব আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতির এক জীবন্ত চিত্র তুলে ধরে।
মুরারিকাটি মেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও এটি আজ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টানসহ সকল সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে একসঙ্গে অংশ নেন, যা সামাজিক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মেলায় আসা দর্শনার্থীরা জানান, এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বের বন্ধন এই মেলাকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।
মেলা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভ কুমার মন্ডল বলেন, বৈশাখের শেষ মঙ্গলবার কালিপূজার মাধ্যমে মেলা শুরু হয় এবং চার দিনব্যাপী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলতে থাকে। শ্রী শ্রী শীতলা পূজার মাধ্যমে মেলার সমাপ্তি ঘটে। এ সময় সিঁদুর খেলা ও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলায় অংশ নেন গ্রামবাসী। তিনি জানান, মেলায় প্রায় শত মণ বাতাসা ও সন্দেশ বিতরণ করা হয়।
কমিটির সভাপতি নির্মল মন্ডল বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয় যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে। পুরো মেলা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয় এবং দর্শনার্থীদের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
মুরারিকাটির এই মেলা কেবল বিনোদনের আয়োজন নয়, বরং এটি গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও এই চার দিনের উৎসব মানুষকে তাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে রাখে।