সংবাদ সম্মেলনে রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, দেশে বর্তমানে হামের যে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তার মূল কারণ সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত টিকার অভাব। ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের টিকার প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত বছর সরকারের পক্ষ থেকে সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ইউনিসেফ তার নিজস্ব ‘প্রি-ফাইন্যান্সিং’ ব্যবস্থার মাধ্যমে মাত্র ১৭.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের টিকা দেশে নিয়ে আসে, যা মোট বার্ষিক চাহিদার এক-তৃতীয়াংশেরও কম। এই টিকাগুলো ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে দেশে পৌঁছালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল নগণ্য। সরকারের কাছ থেকে এই টিকার অর্থ ইউনিসেফ চলতি বছরের এপ্রিল মাসে হাতে পেয়েছে।
রানা ফ্লাওয়ার্স অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আমরা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫ থেকে ৬টি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছি। শেষ চিঠিটি পাঠিয়েছিলাম নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার টেবিলে সেই চিঠিটি থাকবে এবং তিনি বিষয়টি অগ্রাধিকার দেবেন। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বারংবার এই সংকটের বিষয়ে অবহিত করেছি।" তিনি আরও জানান, ইউনিসেফের পক্ষ থেকে এবং ব্যক্তিগতভাবে তিনি নিজে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তত ১০টি বৈঠক করেছেন। প্রতিটি বৈঠকেই তিনি এই মর্মে সতর্ক করেছিলেন যে, টিকা না এলে দেশ এক বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়বে।
টিকা সংকটের নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউনিসেফ প্রতিনিধি একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্ত ছিল যে টিকাও 'উন্মুক্ত দরপত্রের' মাধ্যমে কিনতে হবে। রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, "টিকা কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য বা অ্যান্টিবায়োটিক নয় যে আপনি সস্তা দামের পেছনে ছুটবেন। এটি অত্যন্ত বিশেষায়িত এবং স্পর্শকাতর বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্ট। এর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুমোদিত মান এবং কোল্ড-চেইন বজায় রাখা জরুরি। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মানহীন বা সস্তা টিকা কেনা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।" তিনি মনে করেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত আগে কখনও নেওয়া হয়নি এবং এই প্রক্রিয়াই টিকার সরবরাহে বড় ধরনের বাধা তৈরি করেছে।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, টিকা কর্মসূচিতে এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ শিশু নিয়মিত টিকাদান থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। এটি একটি বিশাল সংখ্যা, যা দীর্ঘমেয়াদে হার্ড ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে দেশের ৫৮টি জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে, যার মধ্যে ৮১ শতাংশ আক্রান্তই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষ করে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে।
তবে আশার কথা হলো, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চলতি বছরের মে মাসে টিকার নতুন চালান দেশে এসেছে। এখন সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই টিকাদান কার্যক্রম জোরালো করা। ইউনিসেফ পরামর্শ দিয়েছে, যেসব শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে তাদের খুঁজে বের করে দ্রুত ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে বস্তি এবং দুর্গম এলাকায় নজরদারি বাড়াতে হবে। রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, "এখন কাউকে দোষারোপ করে লাভ নেই। আমাদের অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে একটি শিশুর মৃত্যুও কাম্য নয়।"
সবশেষে ইউনিসেফ প্রতিনিধি জোর দেন যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। ইউনিসেফ যেহেতু বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিমাণে টিকা কেনে, তাই তারা সবচেয়ে কম দামে এবং সেরা মানের নিশ্চয়তা দিতে পারে। সরকারের উচিত হবে এই অংশীদারিত্বকে আরও সুসংহত করা যাতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আবারও স্থিতিশীল হয়ে ওঠে।