মামুন উজ্জ্বল, কিশোরগঞ্জ থেকে:
ভাগ্যকে সুপ্রসন্ন করতে এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রায় তিন মাস পূর্বে বাজি ধরে রাশিয়া পাড়ি জমিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের কান্দাইল বাগপাড়া গ্রামের যুবক মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন (২৫)। তবে সেখানে গিয়ে ভাগ্য বদলের পরিবর্তে এক চরম ও ভয়ঙ্কর বিপত্তিতে পড়েন তিনি। অবশেষে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের প্ররোচনায় পড়ে অন্য কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন জাহাঙ্গীর। আর এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই তাঁর জীবনের করুণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার পক্ষে সম্মুখ সমরে লড়তে গিয়ে ইউক্রেনীয় মাইন বিস্ফোরণে তিনি নিহত হয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাতে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে কর্মরত জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মৃদুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এসে একটি লাইভ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে তাঁর এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। ভিডিও বার্তা দেওয়া মৃদুলের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। ভিডিও বার্তায় মৃদুল অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করেন, “জাহাঙ্গীরের এমন অকাল ও নির্মম দুর্ঘটনার জন্য ‘আরাফা আল মনোয়ার এজেন্সি’ নামে একটি কোম্পানি সরাসরি দায়ী। তারাই মূলত প্রলোভন দেখিয়ে জাহাঙ্গীরসহ বাংলাদেশিদের যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছে।” এদিকে গতকাল শুক্রবার (২২ মে ২০২৬) জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর খবর করিমগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে জানাজানি হলে তাঁর পরিবার ও পুরো এলাকায় মানুষের মাঝে গভীর শোকের মাতম শুরু হয়। স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে কান্দাইলের বাতাস। নিহত জাহাঙ্গীর হোসাইন করিমগঞ্জ উপজেলার কান্দাইল বাগপাড়া গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে। তিনি মাত্র আড়াই বছর বয়সী এক কন্যাসন্তানের জনক। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে জাহাঙ্গীর ছিলেন সবার বড়, ফলে পরিবারের পুরো দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধেই।
জাহাঙ্গীরের ফুফাতো ভাই মো. রমজান ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে একটি ভালো কোম্পানিতে আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির কথা বলে জাহাঙ্গীরকে উচ্চমূল্যে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রথমে তাঁকে একটি পিগ ফার্মে (শূকরের খামার) কাজ দেওয়া হয়। নোংরা পরিবেশে মাসখানেক কঠিন কাজ করার পর জাহাঙ্গীর মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার কারণে তিনি কাজ পরিবর্তন করতে চাইলে দালালেরা তাঁকে একটি নামী রেস্টুরেন্টে চাকরি দেওয়ার নতুন আশ্বাস দেয়। কিন্তু পরে রেস্টুরেন্টে নেওয়ার নাম করে জাহাঙ্গীরসহ সাতজন বাংলাদেশিকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয় সংশ্লিষ্ট এজেন্সিটি। সেখানে প্রায় দুই মাস কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর সরাসরি ফ্রন্টলাইনে তথা ইউক্রেনীয় যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় তাদের। সম্মুখ যুদ্ধে পাঠানোর মাত্র সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ইউক্রেনীয় মাইন বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই নিহত হন জাহাঙ্গীরসহ তিন বাংলাদেশি।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জাহাঙ্গীরের রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার এই ভয়ঙ্কর বিষয়টি কেবল তাঁর স্ত্রী মাশুকা জানতেন। মাশুকাকে বিষয়টি কাউকেই বলতে নিষেধ করেছিলেন জাহাঙ্গীর। ফলে বৃদ্ধা মা ও পরিবারের অন্য কাউকেই কিছু জানাননি তিনি। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে পরিবারের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের শেষ কথা হয়েছিল। তখন তিনি স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন, তিনি কিছুদিন নেটওয়ার্কের বাইরে প্রত্যন্ত এলাকায় থাকবেন, তাই যোগাযোগ করা সম্ভব হবে না। পরিবারকে চিন্তা করতে বারণ করেছিলেন তিনি। এই কথাই ছিল পরিবারের সাথে তাঁর শেষ কথা।
স্থানীয় জয়কা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “দালালদের খপ্পরে পড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে এক যুবকের এমন মৃত্যুর ঘটনাটি শুনে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। জাহাঙ্গীর হোসাইনের পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা রইল।” করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমরানুল কবির বলেন, “আমি জাহাঙ্গীরের পরিবারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে এবং খোঁজখবর নিয়ে নিশ্চিত হয়েছি যে তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেছেন।”
প্রসঙ্গগত, এর আগে গত ২ মে ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়নের মাঝিরকোনা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুর রশিদের ছেলে মো. রিয়াদ রশিদ (২৮) নিহত হন। সেই শোকের ছায়া কাটতে না কাটতেই একই উপজেলার কান্দাইল বাগপাড়া গ্রামে জাহাঙ্গীরের এই মর্মান্তিক মৃত্যুসংবাদ এলো। একের পর এক রেমিট্যান্স যোদ্ধার এমন করুণ পরিণতিতে পুরো কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়ে এখন শোক আর দালাল চক্রের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আকাশজমিন / আরআর