রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তিসম্পন্ন সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে অটো-জেনারেটেড মামলার প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর থেকেই সাধারণ নগরবাসীর মধ্যে জরিমানা নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। আর জনসাধারণের এই শঙ্কা ও সরলতাকেই এবার নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে সাইবার প্রতারকচক্র। এআই প্রযুক্তির ভুয়া মামলার নোটিশ ও ফিশিং লিংক পাঠিয়ে চালক ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক অভিনব প্রতারণার চিত্র সামনে এসেছে।
এমনই এক প্রতারণার শিকার হতে যাচ্ছিলেন ঢাকার চাকরিজীবী নাহিয়ান আহমেদ। আজ শনিবার (২৩ মে ২০২৬) দুপুরে হঠাৎ তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে ‘+63 948 931 5208’ নামক একটি বিদেশি নম্বর থেকে একটি রহস্যজনক বার্তা (SMS) আসে। তাতে লেখা ছিল, ‘জরিমানা নম্বর: 2026-BD-47821039V। ইন্টেলিজেন্ট ভিডিও নজরদারি ব্যবস্থা অনুযায়ী আপনি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করেছেন। একটি নির্ধারিত এলাকার মধ্যে আপনার যানবাহনটি অবৈধভাবে চালানোর বিষয়টি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। অনুগ্রহ করে ২৩ মে, ২৪:০০ টার আগে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে লগ ইন করে জরিমানা পরিশোধ করুন।’
আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বকেয়া জরিমানা পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনটি জব্দসহ কঠোর প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয় সেই খুদে বার্তায়। এমনকি জরিমানা পরিশোধের নামে একটি ওয়েবসাইটের সন্দেহজনক লিংকও যুক্ত করে দেওয়া হয়। বার্তাটি পেয়ে প্রথমে সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে যান নাহিয়ান আহমেদ। কারণ, বাস্তবে তাঁর কোনো নিজস্ব বা ব্যক্তিগত যানবাহনই নেই।
নাহিয়ান আহমেদ বলেন, “মেসেজটি আসার পর আমি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম। যেহেতু আমার কোনো গাড়ি নেই, তাই আমি সহজেই বুঝেছি এটি একটি নিখাদ প্রতারণা। কিন্তু যাদের নিজস্ব গাড়ি বা মোটরসাইকেল আছে, তারা এই ডিজিটাল নোটিশ দেখে খুব সহজেই বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত হয়ে প্রতারকদের ফাঁদে পা দিতে পারেন, এটাই সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয়।”
এ বিষয়ে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) অলোক কুমার বিশ্বাস তীব্র সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “প্রতারকদের পাঠানো এই ধরনের লিংকে প্রবেশ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এসব ফিশিং (Phishing) লিংকের মাধ্যমে সাইবার অপরাধীরা নিমিষেই ব্যবহারকারীর মোবাইল বা কম্পিউটারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন, “সরকারি নম্বর এবং প্রতারকদের ব্যবহৃত নম্বরের মধ্যে বিন্যাসে কিছু স্পষ্ট পার্থক্য থাকে। কোনো মেসেজ প্রেরকের নম্বরের আগে অতিরিক্ত শূন্য, প্লাস (+) চিহ্ন বা বিদেশি কান্ট্রি কোড থাকলে সেটি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সচেতন হতে হবে।”
এসআই অলোক কুমার বিশ্বাস এ ধরনের কোনো সন্দেহজনক বার্তা পেলে অবিলম্বে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ ফোন করে বিষয়টি যাচাই করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি সন্দেহজনক নম্বর, লিংক বা বার্তার স্ক্রিনশট ডিবি (DB) কিংবা সিআইডি (CID)-এর অফিসিয়াল সাইবার ইউনিটের ফেসবুক পেজে পাঠিয়ে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানান।
এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিসুর রহমান নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, সিসিটিভি ক্যামেরা বা ভিডিও ফুটেজে নিশ্চিত হওয়া মামলার ক্ষেত্রে শুধু মোবাইলে বার্তা পাঠানো হবে না, বরং সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের স্থায়ী ঠিকানায় কাগজের তৈরি প্রাতিষ্ঠানিক নোটিশও পাঠানো হবে। কোনো ব্যক্তি বা অসাধু চক্র যদি ভিডিও ফুটেজের মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করে বা কোনো লিংকে টাকা পাঠাতে বলে, তবে তা থেকে বিরত থাকার জন্য গত ৩ মে ডিএমপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছিল।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (CSE) বিভাগের অধ্যাপক মো. মুস্তাফিজুর রহমান এই ডিজিটাল জালিয়াতি রুখতে একটি স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রতারকরা হুবহু সরকারি ওয়েবসাইটের মতো ক্লোন বা ভুয়া লিংক তৈরি করছে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে চট করে ধরা কঠিন। তাই ট্রাফিক নজরদারি এলাকায় বড় সাইনবোর্ডে স্পষ্টভাবে লিখে দেওয়া উচিত যে জরিমানার অর্থ কোনো অনলাইন লিংকে প্রবেশ করে পরিশোধ করতে হয় না।”
অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, “ঝুঁকি কমাতে যানবাহনের নিবন্ধন বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের সঙ্গে চালকের একটি নির্দিষ্ট ও নিবন্ধিত ব্যাংক হিসাব সরাসরি সংযুক্ত করা উচিত। জরিমানা বিকাশ বা নগদের মতো যত্রতত্র মাধ্যমে পরিশোধের সুযোগ না রেখে স্বয়ংক্রিয় ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন হলে এই ডিজিটাল প্রতারণার ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।”
আকাশজমিন / আরআর