আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দলগুলোর শক্তি-সামর্থ্যের পাশাপাশি মাঠের বাইরের নানা সমীকরণ নিয়েও চলছে জোর আলোচনা। বিশেষ করে দলবদলের বাজারে কোন দলের খেলোয়াড়দের দাম কেমন, তা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের কৌতুহলের শেষ নেই। তবে এবারের বিশ্বকাপে বাজারমূল্যের হিসাবে বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে ফুটবল বিশ্বের দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। ফুটবলারদের দলবদল সংক্রান্ত বিশেষায়িত প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রান্সফাররুম’–এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারমূল্যের দিক থেকে শীর্ষ পাঁচের মধ্যেও জায়গা পায়নি ব্রাজিল, আর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার অবস্থান আরও নিচে।
এবারের বিশ্বকাপে কিছুটা ব্যাকফুটে থেকেই মিশন শুরু করতে যাচ্ছে ব্রাজিল। বিশ্বকাপের মূল স্কোয়াড নিয়ে দলটির যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কাসেমিরোর কণ্ঠেও সেই সুর শোনা গেছে। তিনি সরাসরি বলেছেন, “আমরা তুমুল ফেবারিট দল নই।” ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তির ঘোষণা করা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের বাজারমূল্য বিশ্লেষণ করলেও ঠিক একই চিত্র ফুটে ওঠে। ‘ট্রান্সফাররুম’–এর বিশেষায়িত গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারমূল্যের হিসাবে বিশ্বকাপের দলগুলোর মধ্যে ষষ্ঠ সর্বোচ্চ দামি স্কোয়াড হচ্ছে ব্রাজিলের। উল্লেখ্য, দলবদলের বাজারে ক্লাব, এজেন্ট ও খেলোয়াড়দের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্যে প্রায় এক দশক আগে এই প্রযুক্তিটি তৈরি করা হয়।
এই সমীক্ষায় খেলোয়াড়দের আর্থিক মূল্য নির্ধারণের জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খেলোয়াড়ের বর্তমান বয়স, গত মরশুমের সামগ্রিক পারফরম্যান্স, পুনর্বিক্রয় মূল্য বা ভবিষ্যৎ দলবদলের সম্ভাবনা, ক্যারিয়ারের উন্নতির গ্রাফ, বর্তমান চুক্তির বাকি সময় এবং তাঁরা যে ক্লাবে খেলেন সেখানকার ঘরোয়া লিগের মান কেমন। এসব হিসাব-নিকাশ শেষে দেখা গেছে, এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে দামি স্কোয়াড হিসেবে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ফ্রান্স ফুটবল দল। কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল ওলিসে, উসমান দেম্বেলের মতো বিশ্বমানের তারকাদের উপস্থিতির কারণে ফ্রান্সের স্কোয়াড দামে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। ফরাসিদের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৪৬ কোটি ইউরো।
মূল্য তালিকার শীর্ষ পাঁচের বাকি দলগুলো যথাক্রমে স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি ও পর্তুগাল। এই পাঁচটি দেশকে তাদের স্কোয়াডের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে ‘বিলিয়নিয়ার ক্লাব’ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এই পাঁচ পরাশক্তির ঠিক পরেই ষষ্ঠ স্থানে জায়গা পেয়েছে সেলেসাওরা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনিয়ার মতো ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত তারকা, এনদ্রিক ও রায়ানের মতো প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ এবং নেইমার, দানিলো ও অ্যালেক্স সান্দ্রোর মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারদের এক চমৎকার সমন্বয়ে ব্রাজিল দলে একটি শক্তিশালী ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। ফলে ব্রাজিল জাতীয় দলে ডাক পাওয়া ২৬ জন খেলোয়াড়ের মোট বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ৯৪ কোটি ১০ লাখ ইউরো।
দুই বছর আগে বিশ্ব ফুটবলের বর্ষসেরা হওয়া ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বর্তমানে ব্রাজিলের সবচেয়ে মূল্যবান ফুটবলার। তবে এই বৈশ্বিক সমীক্ষায় বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থান দশম। ভিনির আনুমানিক বাজারমূল্য ১২ কোটি ৮০ লাখ ইউরো। এই তালিকায় শীর্ষ তিনে আছেন যথাক্রমে স্পেনের তরুণ তুর্কী লামিনে ইয়ামাল, নরওয়ের স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড ও ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে।
তবে বাজারমূল্যের এই গাণিতিক হিসাবকে সম্ভবত মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে খুব একটা বেশি গুরুত্ব দিতে রাজি নন ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তাঁর মতে, বর্তমান পারফরম্যান্স বিবেচনা করলে বিশ্ব ফুটবলের সেরা পাঁচ খেলোয়াড়ের মধ্যে দুজনই ব্রাজিলের। আনচেলত্তির ভাষায়, “আমরা সৌভাগ্যবান যে দলে এত প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছে। জাতীয় দলে থাকা বিশ্বের সেরা পাঁচ খেলোয়াড়ের মধ্যে দুজনই ব্রাজিলিয়ান। এই দল বিশ্বের সেরাদের সঙ্গে সমানতালে লড়াই করতে পারবে—এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস আছে।”
অন্য দিকে, বাজারমূল্যের এই তালিকায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার অবস্থান দেখে ব্রাজিলের সমর্থকেরা কিছুটা সান্ত্বনা পেতেই পারেন। কারণ এই তালিকায় ৮ নম্বরে অবস্থান করছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। আলবিসেলেস্তেদের পুরো স্কোয়াডের বর্তমান বাজারমূল্য মাত্র ৭৩ কোটি ৯০ লাখ ইউরো। বিশ্লেষকদের মতে, আর্জেন্টিনার বর্তমান স্কোয়াডের বেশির ভাগ খেলোয়াড় ইউরোপের শীর্ষ সারির ক্লাবগুলোতে নিয়মিত না খেলার কারণেই মূল্য তালিকায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের এমন নাটকীয় পতন দেখা গেছে। তবে মাঠের লড়াইয়ে বাজারমূল্যের এই হিসাব কতটুকু খাটবে, তা সময়ই বলে দেবে।