রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নিজ বাড়ির সামনে দুই বোনের কাছ থেকে চাপাতির মুখে ব্যাগ ও মালামাল ছিনতাইয়ের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জড়িত দুই পেশাদার ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—জুয়েল ওরফে সোর্স আরিফ ও আনোয়ার হোসেন। গতকাল বুধবার আদালত তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রের সদস্যরা মূলত অত্যন্ত সুকৌশলী ও পেশাদার ছিনতাইকারী। তারা এক সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকাতেই বসবাস করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে তারা নারায়ণগঞ্জ এলাকায় নতুন আস্তানা গড়ে তোলে। সেই দূরবর্তী নারায়ণগঞ্জ থেকে পিকআপ গাড়ি নিয়ে এসে তারা নিয়মিত রাজধানীতে এসে ছিনতাইয়ের কাজ সম্পন্ন করতেন। এই ঘটনায় ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি পিকআপ, একটি ধারালো চাপাতি ও ছিনতাই হওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে লুণ্ঠিত একটি ট্রলি ব্যাগ ও একটি মুঠোফোন এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
গতকাল রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কেন্দ্রে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ফজলুল করিম। পুলিশ জানায়, গত ৩১ মে ভোর আনুমানিক ৩টা ৪০ মিনিটে ঠাকুরগাঁও থেকে ঈদের ছুটি কাটিয়ে রাজধানী ঢাকায় ফেরেন দুই বোন। মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোড এলাকায় নিজেদের বাসার সামনে মালামাল নিয়ে গাড়ি থেকে নামার পর, একটি পিকআপে করে আসা তিন ব্যক্তি তাদের ঘিরে ধরে। ছিনতাইকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে ধারালো চাপাতি দেখিয়ে দুই বোনকে জবাই করার ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। এরপর তাদের কাছে থাকা একটি ট্রলি ব্যাগ, একটি হাতব্যাগ ও আরও একটি মালামাল ভর্তি ব্যাগ জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
ভয়াবহ এই ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগীরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে বিষয়টি পুলিশকে জানান। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং আশপাশের নিরাপত্তা ক্যামেরার বা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে গভীর তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী দুই বোনের একজন, যিনি পেশায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা, মোহাম্মদপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি ছিনতাই মামলা দায়ের করেন।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত উপকমিশনার ফজলুল করিম বলেন, মামলার তদন্তে নেমে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে জুয়েল নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সংগৃহীত নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে তাকে ছিনতাই হওয়া ব্যাগ পিকআপে তুলতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে তার দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক তথ্যের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যবহৃত পিকআপ ও ধারালো চাপাতিটি উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত জুয়েলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় আগের আরও পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মাদক মামলা, একটি ডাকাতির মামলা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত দুটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। জুয়েলের পর এই চক্রের অপর সক্রিয় সদস্য আনোয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত উপকমিশনার ফজলুল করিম বলেন, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত ওই পিকআপের চালক ও মালিক সরাসরি এই অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িত। তাকে ইতিমধ্যে পুলিশ শনাক্ত করতে পেরেছে এবং তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে, শিগগিরই সে ধরা পড়বে। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, গ্রেপ্তার হওয়া দুজনের মধ্যে জুয়েল নিজে চাপাতি হাতে দুই বোনকে জিম্মি করেছিলেন এবং আনোয়ার ব্যাগগুলো পিকআপে তুলেছিলেন। এছাড়া এই পুরো ঘটনার পেছনে মূল পরিকল্পনাকারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে আরও একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এবং তাকে গ্রেপ্তারের সুবিধার্থে এই মুহূর্তে তার নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছিনতাই হওয়া মূল ট্রলি ব্যাগটি এখনও উদ্ধার করা যায়নি। কারণ, একজন আসামি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে অপর আসামি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তার স্ত্রীকে দ্রুত লুণ্ঠিত ব্যাগটি অন্যত্র সরিয়ে ফেলতে বলেন। ফলে পুলিশ সেখানে পৌঁছানোর আগেই ব্যাগটি গায়েব করে দেওয়া হয়। মোহাম্মদপুর এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ফজলুল করিম বলেন, মোহাম্মদপুরসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে পুলিশের বিশেষ টহল ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাসস্ট্যান্ড ও ভোরবেলা যেখানে যাত্রীরা গাড়ি থেকে নামেন, সেই স্থানগুলোতে পুলিশের ভ্রাম্যমাণ ও নিয়মিত টহল দল অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে যাতে নাগরিকেরা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন।