ড. মো. শিবলুর রহমান
প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে জনসচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৭৩ সাল থেকে পালিত এই দিবসটি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পরিবেশবিষয়ক গণসচেতনতামূলক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— “Inspired by Nature. For Climate. For Our Future.” অর্থাৎ, “প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।” বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই প্রতিপাদ্য শুধু সময়োপযোগী নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের এক কঠিন বাস্তবতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ, দাবানল, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে যে প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্যহীন সম্পর্কের মূল্য মানবজাতিকে চড়া মূল্যেই দিতে হচ্ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ন, বন উজাড়, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত ভোগবাদী জীবনযাত্রা পরিবেশগত সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
বাংলাদেশের জন্য এই সংকট আরও গভীর। ভৌগোলিক অবস্থান, নিম্নভূমি এবং ঘনবসতিপূর্ণ জনসংখ্যার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষ জলবায়ুজনিত ঝুঁকির কারণে জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।
কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের অর্থনীতি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একইভাবে মৎস্য খাত, প্রাণিসম্পদ, বনজ সম্পদ এবং জনস্বাস্থ্যও নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন বাহকবাহিত রোগের বিস্তার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
এমন বাস্তবতায় পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। এ বিষয়টি উপলব্ধি করেই বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু অভিযোজনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী সম্প্রসারণ, দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং বনায়ন কর্মসূচি এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
সম্প্রতি দেশব্যাপী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের যে উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। বৃক্ষ শুধু আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে না; এটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে বৃক্ষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মাটিক্ষয় রোধ, বৃষ্টিপাতের ভারসাম্য রক্ষা এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উপকূলীয় এলাকায় বৃক্ষরোপণ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি কমাতেও কার্যকর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।
তবে পরিবেশ রক্ষার এই সংগ্রাম কেবল সরকারের একক প্রচেষ্টায় সফল হবে না। পরিবেশ সংরক্ষণ একটি সামষ্টিক দায়িত্ব। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম এবং করপোরেট খাত—সবার সম্মিলিত উদ্যোগই পারে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে। বিশেষ করে পরিবেশ শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু ও তরুণদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব আচরণ গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
বর্তমানে দেশের অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব নীতি ও কার্যক্রম গ্রহণ করছে। গ্রিন ব্যাংকিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক পদ্ধতি এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগগুলো ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ সচেতনতা কর্মসূচি এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করছে, যা প্রশংসনীয়।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও পরিবেশ সংরক্ষণের অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা, গণপরিবহন ব্যবহার বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত হওয়া এবং বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা—এসব ছোট পদক্ষেপও পরিবেশ রক্ষায় বড় অবদান রাখতে পারে। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সবসময় বড় প্রকল্পের প্রয়োজন হয় না; অনেক সময় ব্যক্তিগত সচেতনতা ও দায়িত্ববোধই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশ আন্দোলনের মূল শক্তিতে পরিণত করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জলবায়ু সচেতনতা বৃদ্ধিতে তরুণদের ভূমিকা ইতোমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশেও তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, গবেষণা এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা একটি সবুজ ভবিষ্যৎ নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃতি ও মানবসভ্যতা একে অপরের পরিপূরক। প্রকৃতি ধ্বংস করে কখনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই হতে হবে আগামী দিনের মূল দর্শন। কারণ প্রকৃতি শুধু আমাদের জীবনের ভিত্তিই নয়; এটি আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এর এই প্রেরণাদায়ক প্রতিপাদ্য আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—প্রকৃতির কাছ থেকেই আমাদের ভবিষ্যতের পথ খুঁজে নিতে হবে। প্রকৃতি আমাদের সহনশীলতা, অভিযোজন এবং টিকে থাকার শিক্ষা দেয়। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে অন্তত একটি করে গাছ রোপণের অঙ্গীকার করি, পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রা অনুসরণ করি এবং একটি সবুজ, নিরাপদ ও জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখি।
মনে রাখতে হবে, আজকের ছোট উদ্যোগই আগামী দিনের বড় পরিবর্তনের ভিত্তি। আমাদের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে। প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত অনুপ্রেরণাই হতে পারে জলবায়ু সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার এবং মানবজাতির টেকসই ভবিষ্যতের সর্বোত্তম পথনির্দেশক।
লেখক:
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (NSTU)
সহযোগী অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
অতিরিক্ত পরিচালক, আইকিউএসি (IQAC)।