ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান

ফিফার তালিকায় থেকেও বর্ণবাদের শিকার

আফ্রিকার সেরা রেফারি আরতানকে দেশে ঢুকতে দিল না আমেরিকা


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ০৯ জুন, ২০২৬ সময় : ৪:৫৭ পিএম

চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের জমকালো আসরকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যখন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে, ঠিক তখনই মাঠের বাইরের ভূ-রাজনীতি আর কঠোর অভিবাসন নীতি ক্রীড়ামোদীদের মাঝে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এবার ফুটবলের এই মহোৎসবে ম্যাচ পরিচালনার জন্য আমেরিকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট আমন্ত্রণ ও ফিফার তালিকায় থেকেও দেশটিতে প্রবেশ করতে পারলেন না আফ্রিকার সেরা রেফারি ওমর আরতান। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে রেফারির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার উদ্দেশ্যে তিনি ইতিমধ্যে সুদূর আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় এসে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু মার্কিন মাটি স্পর্শ করার পরও তাকে দেশে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। গত শনিবার আমেরিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার দক্ষিণ ফ্লোরিডায় পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরেই তাকে আটকে দেওয়া হয় এবং সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে পুনরায় মেক্সিকো বা নিজ গন্তব্যে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম তথ্য নিশ্চিত করেছে।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করা এই ঘটনাটির বিষয়ে আমেরিকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার কাছে আনুষ্ঠানিক সত্যতা নিশ্চিত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় মুখপাত্র আরতানের বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রেফারি ওমর আরতানকে মূলত তাঁর ব্যাকগ্রাউন্ড ও সুরক্ষাজনিত চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত গভীর উদ্বেগের কারণে মার্কিন ভূখণ্ডে প্রবেশে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে। আর এই নিরাপত্তার কারণেই তাঁকে আমেরিকার মাটিতে প্রবেশের আইনি অনুমতি দেওয়া হয়নি।’ তবে সুরক্ষাজনিত সেই সুনির্দিষ্ট উদ্বেগ বা কারণটি আসলে ঠিক কী ছিল, সেই বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিস্তারিত বা স্পষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

উল্লেখ্য, রেফারি ওমর আরতান বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফা কর্তৃক নির্বাচিত ৫২ জন বিশ্বকাপ ম্যাচ অফিশিয়াল বা রেফারির চূড়ান্ত তালিকায় সগৌরবে স্থান পেয়েছিলেন। যদি তিনি এই বিশ্বকাপে মাঠে নামার সুযোগ পেতেন, তবে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় তিনিই হতেন বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ম্যাচ পরিচালনাকারী প্রথম সোমালি রেফারি। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে তাঁর সেই স্বপ্ন ভেস্তে গেল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আরতানের দেশ সোমালিয়া বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা ট্রাভেল ব্যানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শুধু তাই নয়, গত বছরের শেষ দিকে ট্রাম্প আমেরিকায় বসবাসরত সোমালি অভিবাসীদের উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অবমাননাকর মন্তব্য করে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। আরতানের এই ঘটনাটি সেই বৈরী রাজনৈতিক সম্পর্কেরই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে চলমান বিশ্বকাপে আমেরিকার এমন কঠোর ও বিতর্কিত ভিসা নীতির শিকার কেবল সোমালি রেফারি আরতান একাই নন; এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী অন্যতম শক্তিশালী দল ইরানের জাতীয় ফুটবল দলকেও বড় ধরনের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আমেরিকার ভিসা না পাওয়ায় বা জটিলতার কারণে ইরানি ফুটবল দলকে তাদের মূল বেস ক্যাম্প আমেরিকার বাইরে মেক্সিকোতে স্থাপন করতে হয়েছে। ফুটবল খেলার নির্দিষ্ট দিনে তারা বিশেষ অনুমতিতে আমেরিকায় প্রবেশ করতে পারলেও খেলা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তাদের পুনরায় প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হচ্ছে। এমনকি ইরান দলের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কোচিং স্টাফকে আমেরিকার ভিসাই দেওয়া হয়নি।

মার্কিন প্রশাসনের এমন একচোখা ও বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরেই তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি ট্রাম্প প্রশাসনের এই বিতর্কিত ও অভিবাসী বিরোধী পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। বিশেষ করে বিশ্বকাপ চলাকালে নিউইয়র্ক শহরে ফেডারেল অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ বিভাগের (আইসিই) এজেন্টদের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ানোর যে পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসন করেছে, তা নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

মেয়র মামদানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অত্যন্ত শক্ত ভাষায় লিখেছেন, ‘অভিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অবদান ছাড়া আজকের আধুনিক ফুটবলের কোনো অস্তিত্বই থাকত না। অভিবাসীরাই এই জনপ্রিয় খেলায় অংশ নেন, নতুন প্রজন্মকে কোচিং করান, মাঠের সংস্কার কাজে ঘাম ঝরান, গ্যালারি ভর্তি করে উন্মাদনা তৈরি করেন এবং বিশ্বকাপের মতো এত বড় বিশ্ব উৎসবকে সফল করে তোলেন। এমনকি আমেরিকার বর্তমান পুরুষ জাতীয় ফুটবল দলের অন্যতম সেরা ছয়জন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ও হলেন মূলত অভিবাসী।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা আইসিই বা অন্য কোনো ফেডারেল সংস্থাকে আমাদের শহরের শান্তিপূর্ণ সম্প্রদায় ও উৎসবের মাঝে কোনো ধরনের ভয় ছড়াতে দেব না — বিশেষ করে বিশ্বকাপের এই আনন্দের মুহূর্তে তো নয়ই। বিশ্ব যখন আমাদের প্রিয় শহরে খেলা দেখতে আসছে, তখন আমরা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে আমাদের অভিবাসী প্রতিবেশীদের পাশে বুক চিতিয়ে দাঁড়াব এবং বর্ণবাদী এই বিভেদের আক্রমণকে সম্মিলিতভাবে প্রত্যাখ্যান করব।’

এর আগে এ বছরের শুরুর দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুতে আল জাজিরার সঙ্গে দেওয়া এক আবেগঘন সাক্ষাৎকারে রেফারি ওমর আরতান বলেছিলেন, বছরের পর বছর ধরে সোমালিয়ার চরম রাজনৈতিক কষ্ট, যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যেও ফুটবলের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে জায়গা পাওয়া তাঁর এবং তাঁর দেশের জন্য এক পরম 'সম্মানের বিষয়'। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘রেফারি হিসেবে মাঠ এবং জীবন—কোথাও হার মানা চলে না। সাফল্যের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হয়। আমার এই লক্ষ্য ছিল, তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে উঠে এসে কাজটা মোটেও সহজ ছিল না।’ তবে তাঁর সেই ত্যাগ ও লড়াই শেষ পর্যন্ত মার্কিন রাজনীতির বেড়াজালে আটকে গেল।


এ সম্পর্কিত আরো খবর