বিশ্বফুটবলের ইতিহাসের পাতায় মহাতারকা লিওনেল মেসির নাম বহু আগেই স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসেও পেনাল্টি থেকে গোল করার ক্ষেত্রে এক অনন্য ও আকাশচুম্বী কীর্তি নিজের দখলে রেখেছেন এই আর্জেন্টাইন জাদুকর। বিশ্বকাপের মূল ম্যাচে অর্থাৎ নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলার মধ্যে স্পট কিক বা পেনাল্টি থেকে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছেন লিওনেল মেসি। মূল ম্যাচে পেনাল্টি থেকে তিনি সব মিলিয়ে ৪টি গোল করেছেন, যা বিশ্বকাপের শতবর্ষের ইতিহাসে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ড।
এই অবিশ্বাস্য রেকর্ডের মাধ্যমে মেসি বিশ্বফুটবলের কিংবদন্তি পর্তুগালের ব্ল্যাক প্যান্থার খ্যাত ইউসেবিও, নেদারল্যান্ডসের গতি তারকা রব রেনসেনব্রিঙ্ক, আর্জেন্টিনার সাবেক গোলমেশিন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা এবং ইংল্যান্ডের বর্তমান তারকা স্ট্রাইকার হ্যারি কেইনকে স্পর্শ করেছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে মূল খেলার মধ্যে পেনাল্টি থেকে চারটির বেশি গোল করার কৃতিত্ব এখন পর্যন্ত বিশ্বের আর কোনো ফুটবলার দেখাতে পারেননি। সবচেয়ে মজার এবং বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, মূল ম্যাচে মেসির এই ৪টি পেনাল্টি গোলই এসেছে মূলত ২০২২ সালের স্মরণীয় কাতার বিশ্বকাপে। সেই স্বপ্নের টুর্নামেন্টে তিনি একে একে সৌদি আরব, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া এবং ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সের বিপক্ষে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় নিখুঁত স্পট কিকে এই গোলগুলো করেছিলেন।
তবে বিশ্বকাপে স্পট কিকের ক্ষেত্রে মেসির সব ধরনের প্রচেষ্টা কিন্তু শতভাগ সফলতায় রূপ নেয়নি। বিগত ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন আইসল্যান্ডিক গোলরক্ষক হ্যানেস হালদোরসন। আর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও গ্রুপ পর্বের ম্যাচে পোল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর নেওয়া আরেকটি শক্তিশালী স্পটকিক রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন পোলিশ প্রাচীর ভয়চেখ শেজনি। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফার অফিশিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বকাপে মূল ম্যাচের নির্ধারিত সময়ে মেসি সর্বমোট ছয়টি পেনাল্টি শট নিয়েছেন। এর মধ্যে চারটিতে তিনি সফলভাবে গোল করেছেন এবং দুটিতে ব্যর্থ হয়েছেন, যার ফলে বিশ্বমঞ্চে পেনাল্টিতে তাঁর সফলতার হার দাঁড়ায় ৬৬.৭ শতাংশ।
অবশ্য মূল ম্যাচের বাইরে নকআউট পর্বের ভাগ্য নির্ধারণী পেনাল্টি শুটিং বা টাইব্রেকারের হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ আলাদা। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টাইব্রেকারের স্নায়ুচাপের মুহূর্তে মেসি আরও তিনটি পেনাল্টি নিয়েছেন এবং তিনটিতেই তিনি শতভাগ সফল হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডস ও ফাইনালের মহালড়াইয়ে ফ্রান্সের বিপক্ষে টাইব্রেকারে প্রথম শটেই লক্ষ্যভেদ করেছিলেন তিনি।
পেনাল্টি থেকে গোলের এই চোখধাঁধানো রেকর্ডের পাশাপাশি সামগ্রিক গোলসংখ্যাতেও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা ও ভয়ংকর ফুটবলার লিওনেল মেসি। ২০০৬ থেকে শুরু করে ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি আর্জেন্টিনার আকাশী-নীল জার্সিতে করেছেন মোট ১৩টি গোল। এর মধ্যে ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপে একটি, ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে চারটি, ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে একটি এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ সাতটি গোল করেন তিনি। শুধু ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপেই গোলের দেখা পাননি এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় মেসি বর্তমানে যৌথভাবে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছেন। এই তালিকার শীর্ষে আছেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোজা (১৬ গোল)। দ্বিতীয় স্থানে ব্রাজিলের ফেনোমেনন রোনালদো (১৫ গোল) এবং তৃতীয় স্থানে জার্মানির গার্ড মুলার (১৪ গোল)। এরপরই ১৩টি করে গোল নিয়ে যৌথ চতুর্থ স্থানে রয়েছেন ফ্রান্সের জাস্ট ফঁতেন ও আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি।