বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ বা ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই মেগা আসরে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের হেক্সা বা ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের মিশন নিয়ে মাঠে নামতে যাচ্ছে ল্যাটিন পরাশক্তি ব্রাজিল। তবে এই মহা অভিযানের ঠিক আগমুহূর্তে বিশ্ব মিডিয়া ও ফুটবল সমালোচকদের উদ্দেশ্যে নিজেদের দলের প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন সেলেসাওদের মাঝমাঠের প্রধান তারকা ও মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারায়েস। ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ব্রাজিল সর্বশেষ ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে তাদের পঞ্চম শিরোপা জিতেছিল। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৪টি বছর এবং এই সময়ে অনুষ্ঠিত পাঁচটি বিশ্বকাপের মধ্যে চারবারই তাদের সোনালী ট্রফি জয়ের যাত্রা থমকে গেছে কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে। এবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ব্রাজিল অংশ নিচ্ছে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ষষ্ঠ স্থানে থেকে। এর পাশাপাশি অতীতের মতো বিশ্ব ফুটবল একচ্ছত্রভাবে শাসন করা কিংবদন্তি সুপারস্টারদের উপস্থিতি বর্তমান সেলেসাও স্কোয়াডে তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম হওয়ায় বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে গড়ে তোলা ব্রাজিল দলের অফিশিয়াল বেস ক্যাম্পে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইংলিশ ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেডের এই নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারায়েস অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “বিশ্বের অন্য কোনো ফুটবল খেলুড়ে দেশের জাতীয় দলের জার্সিতে আমাদের মতো পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের সোনালী তারকা খচিত লোগো নেই। আমাদের বর্তমান দলে রিয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং বার্সেলোনার রাফিনিয়ার মতো বিশ্বমানের তারকা ফুটবলার রয়েছে, যারা এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা এবং বড় ক্লাবগুলোর হয়ে ইউরোপ মাতানো ফুটবল খেলছে। তাই আমাদের বর্তমান তরুণ স্কোয়াড ও ফুটবলারদের অবশ্যই তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া উচিত।” উল্লেখ্য, ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের অত্যন্ত কঠিন বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মাত্র পঞ্চম স্থানে থেকে কোনোমতে মূল পর্বে জায়গা করে নেয়। বাছাইপর্বের টেবিলে তারা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও শীর্ষে থাকা আর্জেন্টিনার চেয়ে রেকর্ড ১০ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল, যা নিয়ে ভক্তদের মনে ক্ষোভ ছিল। তবে আগামী শনিবার নিউ ইয়র্কের উপকণ্ঠে অবস্থিত বিখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শক্তিশালী মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে সেলেসাওদের এবারের মূল বিশ্বকাপ অভিযান।
অবশ্য বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নামার আগে খেলা দুটি অফিশিয়াল প্রস্তুতি ম্যাচেই দুর্দান্ত জয় পেয়ে নিজেদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে সেলেসাওরা। রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে তারা পানামাকে ৬-২ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দেওয়ার পর ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে আফ্রিকান পরাশক্তি মিসরকে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করেছে। মিসরের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করা ব্রুনো গিমারায়েস নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “বিশ্বকাপের ঠিক আগে এর চেয়ে ভালো অনুভূতি আর হতেই পারে না। আমরা দুটি প্রস্তুতি ম্যাচেই অত্যন্ত দাপটের সাথে জিতেছি এবং সুন্দর ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছি। দলের কিছু বিষয়ে এখনও কাজ করার বা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে আমরা নিজেদের মূল লড়াইয়ের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলেই মনে করছি।” তিনি আরও যোগ করেন, “একবার বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গেলে মানুষ অতীতের খারাপ পারফরম্যান্স বা বাছাইপর্বের দৈন্যদশা সবকিছুই ভুলে যায়। আমরা চাই যেকোনো মূল্যে মরক্কোর বিপক্ষে জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করতে, যাতে সামনের কঠিন পথচলার জন্য একটি শক্ত ও মজবুত মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়।”
এবারের টুর্নামেন্টে গ্রুপ ‘সি’-তে ব্রাজিলের অন্য দুই প্রতিপক্ষ দল হলো হাইতি ও স্কটল্যান্ড। এদিকে দলের প্রাণভোমরা নেইমার জুনিয়র গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে আদৌ মাঠে নামতে পারবেন কি না, তা নিয়ে এখনও চরম উৎকণ্ঠা ও অপেক্ষায় রয়েছে পুরো দল। বার্সেলোনা ও প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের সাবেক এই গ্লোবাল তারকার বয়স এখন ৩৪ বছর এবং বর্তমানে তিনি খেলছেন ব্রাজিলের ঘরোয়া ক্লাব সান্তোসে। ইনজুরির কারণে ২০২৩ সালের পর থেকে জাতীয় দলের হয়ে আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেননি তিনি। তা সত্ত্বেও নেইমারের অভিজ্ঞতা ও মেধার ওপর ভরসা রেখে তাঁকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করার এক মস্ত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন অভিজ্ঞ কোচ কার্লো আনচেলত্তি। কিন্তু মার্কিন মুলুকে অনুশীলনের সময় আবারও পায়ের পেশীতে নতুন করে চোট পেয়ে দুই থেকে তিন সপ্তাহের জন্য পুরোপুরি মাঠের বাইরে চলে যান এই ফরোয়ার্ড।
নেইমারের এই ইনজুরির ধাক্কার পাশাপাশি এরই মধ্যে মূল স্কোয়াডে একটি বড় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন। উরুর মারাত্মক পেশীর চোটে বিশ্বকাপ শুরুর আগেই দল থেকে ছিটকে গেছেন রোমার নির্ভরযোগ্য ফুলব্যাক ওয়েসলি। তাঁর বিকল্প হিসেবে জরুরি ভিত্তিতে দলে নেওয়া হয়েছে ২৬ বছর বয়সী প্রতিভাবান মিডফিল্ডার এডারসনকে। ইতালিয়ান ক্লাব আতালান্তার হয়ে খেলা এই ফুটবলার চলতি বিশ্বকাপ শেষেই ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিতে পারেন বলে ফুটবল পাড়ায় জোর গুঞ্জন রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত ছিটকে যাওয়া সতীর্থ ওয়েসলির দ্রুত সুস্থতা কামনা করে ব্রুনো গিমারায়েস আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে দেশের হয়ে খেলা যেকোনো ফুটবলারের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ও অনন্য অর্জনগুলোর একটি। আমরা সবাই আশা করি ওয়েসলি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার মাঠে ফিরবে।”