ব্রাজিলিয়ান পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়রকে নিয়ে তাঁর বিশ্বজুড়ে থাকা ভক্ত-সমর্থকদের আক্ষেপের শেষ নেই। সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার সব ধরনের আভাস ও সম্ভাবনা দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন নেইমার। ফুটবল দলবদলের ইতিহাসে এখনো তিনি বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার হিসেবে নিজের রেকর্ড ধরে রেখেছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—নিজের ফুটবলীয় সামর্থ্যের প্রতি কি আদেও সুবিচার করতে পেরেছেন নেইমার? উত্তরটা হয়তো নেতিবাচক। একসময় বিশ্ব ফুটবল শাসন করা ব্রাজিলের এই যে বর্তমান ছন্দপতন, সাম্বাশিল্প আজ যে স্তরে থাকার কথা ছিল সেখানে না থাকা কিংবা ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের আশায় প্রায় দুই যুগ পার করে দেওয়া; এর পেছনে নেইমারের কি একটুও দায় নেই?
মাঠের বাইরের জীবনটা তাঁর দারুণ চাকচিক্যে ভরা এবং মানুষ হিসেবে তিনি অত্যন্ত আমুদে স্বভাবের। কিন্তু সবুজ গালিচায় কাটানো তাঁর দৃশ্যগুলোর দিকে তাকালে বেশির ভাগ জুড়েই দেখা যায় চোটের বেদনা, অপূর্ণতা আর চরম হাহাকার। বিপুল সামর্থ্য থাকার পরও নিজেকে লিওনেল মেসি বা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেননি। জিততে পারেননি মর্যাদাপূর্ণ ব্যালন ডি’অর কিংবা ফিফা দ্য বেস্ট পুরস্কার। এসবের সঙ্গে একটি বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে না পারা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অপ্রাপ্তি হয়ে আছে। তবু নেইমার সবসময় আলোচনায় থাকেন। কারণ ৩৪ পেরিয়ে যাওয়া এই ফরোয়ার্ড এখনো যে ব্রাজিলের বড় ভরসার নাম। বেপরোয়া জীবন, চোট এবং নানা বিতর্কই তাঁকে বারবার খবরের শিরোনামে নিয়ে আসে।
একের পর এক চোটে পড়ে নিজের ক্যারিয়ারের প্রায় ১৪০০ দিন মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে নেইমারকে। প্রায় তিন বছর পর চোটকে সঙ্গী করেই ব্রাজিল স্কোয়াডে জায়গা পেয়ে বিশ্বকাপ খেলতে গেছেন তিনি। কোচ কার্লো আনচেলোত্তি তাঁর ওপর আস্থা রেখেছেন বলেই তিনি আজ বিশ্বমঞ্চে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেইমার ইঙ্গিত দিয়েছেন, ২০২৬-ই হতে চলেছে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। নিশ্চয়ই তিনি সাফল্যের শিখরে পৌঁছে শেষটা রাঙাতে চাইবেন। কিন্তু যদি তিনি তা না পারেন, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মে নেইমারের ফুটবলীয় উত্তরসূরি কে হবেন?
বাবার পথ ধরে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর ছেলে ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়র কিংবা লিওনেল মেসির তিন ছেলে ফুটবলে মনোনিবেশ করেছে। কিন্তু নেইমারের একমাত্র ছেলে দাভি লুকা নামকাওয়াস্তে ফুটবলার। ১৫ ছুঁই ছুঁই এই কিশোর বাবার খেলা দেখতে মাঠে যায়, তবে নিজের ফুটবলীয় পরিসর বন্ধুদের সঙ্গে খেলার মাঝেই সীমাবদ্ধ। ছেলে লুকার ওপর কখনো ফুটবলার হওয়ার চাপ দেননি নেইমার। ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে বন্ধুরা মিলে ফুটবল খেলতে ভালোবাসে। তবে ফুটবলের প্রতি ওর অতটা টান নেই। সে মেসি, এমবাপ্পে ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে খুব পছন্দ করে। ভিডিও গেম খেলার সময় ওর দলের আক্রমণভাগে থাকে মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে আর আমি।’
লুকা ছাড়াও নেইমারের আরও তিন কন্যাসন্তান আছে—মাভি, হেলেনা ও মেল। যাদের বয়স এখনও অনেক কম। নেইমার মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, কন্যাসন্তানদের আগমনই তাঁর বেপরোয়া জীবন বদলে দিয়েছে এবং তাঁকে দায়িত্ববান হতে শিখিয়েছে। বিভিন্ন নারীতে আসক্ত নেইমার এখন ব্রুনা বিয়ানকার্দিকে নিয়ে থিতু হয়েছেন। যিনি তাঁর দুই কন্যাসন্তানের মা। যে নেইমার ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন একমাত্র ছেলেকে নিয়ে, চার বছরের ব্যবধানে তিনি নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন চার সন্তানের বাবা হিসেবে। এবার নেইমারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—কোচ আনচেলোত্তির অধীনে ব্রাজিলকে ‘হেক্সা’ জিতিয়ে ষষ্ঠ স্বর্গে নিয়ে যাওয়া। নেইমার ভক্তরা চান, বাবার এই সাফল্য দেখে হয়তো ছেলে লুকারও পেশাদার ফুটবলার হওয়ার শখ জাগবে।