সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে এক চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাল। ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশের মাধ্যমে গত ১২ জুন গ্রেপ্তার হওয়া এই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, মানবতাবিরোধী অপরাধ, জমি দখল ও অর্থ পাচারসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষমতা ও অপরাধের বলয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রবল প্রতাপশালী বেনজীর আহমেদ ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার, র্যাবের মহাপরিচালক এবং পুলিশের শীর্ষ পদ আইজিপিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৮ সালে পুলিশে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তা ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। ক্ষমতার শীর্ষে থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমলেও তদন্তের সুযোগ ছিল সীমিত। ২০২৪ সালের ৪ মে দুর্নীতির অনুসন্ধানের মধ্যেই তিনি দেশ ছাড়েন। এর তিন মাস পর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তাঁর দুর্নীতির নথিপত্র জনসম্মুখে আসে।
মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গুমের অভিযোগ বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ড। ওই ঘটনায় ৫৮ জন নিহতের ঘটনায় করা মামলায় তিনি অন্যতম আসামি। এছাড়াও র্যাবের টিএফআই সেলে গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ চলমান মামলায় ১৭ জন আসামির মধ্যে বেনজীর আহমেদ অন্যতম। এই মামলায় বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও অর্থ পাচার দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জা ও দুই কন্যার বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে চারটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বেনজীর ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা অবৈধভাবে অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার তথ্য গোপন করেছেন। তাঁর স্ত্রীর নামে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ ও ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার তথ্য গোপনের প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারসহ বিপুল সম্পত্তির হদিস পাওয়া গেছে, যা আদালতের আদেশে জব্দ করা হয়েছে। একইসাথে ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।
জমি দখল ও জালিয়াতি গোপালগঞ্জের বৈরাগীটোল গ্রামে ৬০০ বিঘার বেশি জমির ওপর তিনি গড়ে তুলেছিলেন সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি ভয় দেখিয়ে ও জোরপূর্বক দখলের মাধ্যমে এই রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আনন্দ হাউজিং সোসাইটির নাম ভাঙিয়ে জলাশয় ভরাট করে জমি দখলের অভিযোগও প্রমাণিত। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও শর্ত শিথিল করে তা বাগিয়ে নেওয়া এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সেই ডিগ্রি স্থগিতের ঘটনা তাঁকে বিতর্কিত করে।
পাসপোর্ট জালিয়াতি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তথ্য গোপন করে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে পাসপোর্ট গ্রহণ করেন বেনজীর আহমেদ। ২০১৬ সালে এই জালিয়াতি করতে গিয়ে তৎকালীন র্যাব সদর দপ্তরের সহায়তায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট পাওয়ার ঘটনা তাঁর ক্ষমতার দাপটকেই প্রমাণ করে। অন্যদিকে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার তালিকায় বেনজীর আহমেদ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
শীঘ্রই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশে ফিরলে এসব গুরুতর মামলার মুখোমুখি হতে হবে সাবেক এই পুলিশ প্রধানকে।