আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি
প্রশাসনিক নীতি ও সততার কঠিন পরীক্ষায় বারবার উত্তীর্ণ এক আপসহীন সরকারি কর্মকর্তাকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সিলেটের অভিভাবক, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমকে আকস্মিক এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে বদলি করা হয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে জারি করা এই আকস্মিক আদেশের খবরটি গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সিলেটের সর্বস্তরের আপামর জনগণ মানসিকভাবে প্রচণ্ড ব্যথিত, মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মনে এখন এই বড় প্রশ্নটিই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে যে, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করাই কি শেষ পর্যন্ত এই সৎ ও কর্মঠ কর্মকর্তার আকস্মিক বিদায়ের মূল কারণ? মাঠ প্রশাসনে সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠা একজন সুযোগ্য নেতার এমন প্রস্থানকে সহজভাবে নিতে পারছেন না কেউই।
সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সারওয়ার আলম তাঁর কাজের মাধ্যমে প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক ধারার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাঁর অনন্য ও যুগান্তকারী কাজের অন্যতম প্রধান নজির ছিল সিলেটের বিখ্যাত ভোলাগঞ্জের ‘সাদা পাথর’ পর্যটন কেন্দ্রটিকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন করা। ওই অঞ্চলের এক প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত এই স্পট থেকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে কোটি কোটি টাকার পাথর লুটপাট করে আসছিল। সারওয়ার আলম দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপের কাছে মাথা নত না করে সরাসরি যুদ্ধংদেহী মাঠে নেমে ধারাবাহিক টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি কেবল চুরি যাওয়া বিপুল পরিমাণ পাথর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ উদ্ধারই করেননি, বরং মাফিয়াদের হাতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া পর্যটন স্পটটিকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নতুন করে ঢেলে সাজান। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের নিরাপত্তা ও আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ফলে এই খাত থেকে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আদায় এক ধাক্কায় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলে।
শুধু পর্যটন খাতের উন্নয়নই নয়, দেশের জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের একাধিক অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর সাধারণ নির্বাচনে তিনি প্রধান রিটার্নিং অফিসার হিসেবে অতুলনীয় ও সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন। নির্বাচনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল থেকে নানা ধরনের সূক্ষ্ম ও প্রত্যক্ষ চাপ এলেও তিনি নিজের নীতি ও নৈতিকতা থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি। দেশের প্রচলিত আইন ও নির্বাচনী বিধিমালা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করে তিনি সিলেটের সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের মনে এক অবিচল আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন। সিলেটের মতো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত উত্তপ্ত ও স্পর্শকাতর একটি সীমান্ত এলাকায় সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া ছিল তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় এবং গৌরবময় সাফল্য।
তবে সারওয়ার আলমের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক পদক্ষেপটি ছিল উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর পবিত্র মাজার শরিফের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও চরম দুর্নীতি দমন করা। এই পুণ্যময় মাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা বছরের পর বছর ধরে এক শ্রেণির অসাধু মানুষের অবৈধ আয়ের প্রধান আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। মাজারের পবিত্র দানবাক্সগুলোতে ধর্মপ্রাণ মানুষের দেওয়া কোটি কোটি টাকার কোনো সঠিক হিসাব বা অডিট সাধারণ মানুষের সামনে ছিল না। একটি বিশেষ প্রভাবশালী ও স্বার্থান্বেষী চক্র এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নিজেদের পকেটে পুরত। ডিসি সারওয়ার আলম দায়িত্ব নিয়েই মাজারের শত বছরের পুরোনো ও একচেটিয়া মোতাওয়াল্লি ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে সেখানে সরাসরি সরকারের প্রত্যক্ষ ও আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মাজারের সর্বস্তরের আয়-ব্যয়ের হিসাবকে কঠোর অডিটের আওতায় নিয়ে আসেন এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আধুনিক ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা বা ক্যাশলেস সিস্টেম চালু করেন। তাঁর এই আপসহীন ও ঐতিহাসিক হস্তক্ষেপে মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের লুটপাট চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এবং ভক্তদের পবিত্র দান সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতে শুরু করে। এই সাহসী পদক্ষেপে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ পরম স্বস্তি পেলেও, রাতারাতি নিজেদের অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সুবিধাভোগী মহল তাঁর ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ও নাখোশ হয়।
হঠাৎ করে আসা এই বদলির আদেশে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রশাসনিক কারণ বা কৈফিয়ত উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এটি কি সরকারের রুটিন বা নিয়মিত বদলি, নাকি মাজার কেন্দ্রিক সেই কোটি টাকার শক্তিশালী অপরাধী সিন্ডিকেট ভাঙার গোপন প্রতিশোধ বা বলির পাঁঠা— তা নিয়ে জনমনে তীব্র সংশয় ও গভীর রহস্যের দানা বেঁধেছে। এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সিলেটের একজন অত্যন্ত প্রবীণ ও সম্মানিত সাংবাদিক বলেন, যে সৎ অফিসার নিজের জীবন বাজি রেখে চোরাচালান বন্ধ করেন, মাজারের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি থামান এবং একটি অঞ্চলের সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করেন— তাঁকে উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বা সম্মাননা না দিয়ে এভাবে হঠাৎ করে মাঝপথে সরিয়ে দেওয়া হলে মাঠ প্রশাসনের অন্যান্য তরুণ কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে কী বার্তা পাবেন? তাঁরা কি এরপর থেকে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর ন্যূনতম সাহস ও নৈতিক শক্তি নিজেদের মধ্যে ধরে রাখতে পারবেন?
বিশ্লেষকদের মতে, সৎ অফিসারদের এভাবে কোণঠাসা করার ঘটনাটি বাংলাদেশে একেবারে নতুন নয়। কিছুদিন আগেই কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ইকবাল হোসেনকেও ঠিক একইভাবে জেলার বিভিন্ন বড় বড় অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণে আকস্মিক বদলি করা হয়েছিল। দেশের বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভালো কাজ করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো দক্ষ অফিসারদের এভাবে হঠাৎ করে অনাকাঙ্ক্ষিত বদলি বা ওএসডি করা বর্তমানে এক দুঃখজনক ধারায় পরিণত হয়েছে। এর ফলে প্রশাসনের ভেতরে চাটুকারিতা ও দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য জ্যামিতিক হারে বাড়ছে এবং সৎ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তারা মানসিকভাবে চরম কোণঠাসা ও অসহায় হয়ে পড়ছেন।
অথচ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।” সিলেটের বিদায়ী ডিসি সারওয়ার আলম মূলত সংবিধানের সেই পবিত্র মূল চেতনা ও নির্দেশনাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আসছিলেন। এমনকি সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর প্রধান শর্ত অনুযায়ীও, একজন সরকারি কর্মচারীকে সর্বদা সর্বোচ্চ সততা, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সাথে নিজের অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে হয়। এখন সচেতন মহলের বড় প্রশ্ন হলো, সততা ও নিষ্ঠার সাথে পবিত্র দায়িত্ব পালনের চূড়ান্ত পরিণতি যদি এমন অসময়ের বলিপূর্বক বদলি হয়, তাহলে সরকারি বিধিমালার সেই মূল নৈতিক চেতনা কি মারাত্মকভাবে ব্যাহত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয় না?
এই বদলির আদেশের পর নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও নিন্দা জানানো হয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, সারওয়ার আলম সিলেটের শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের জন্য প্রকৃতির এক অকৃত্রিম আশীর্বাদ ছিলেন। দেশের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে তাঁর মতো সৎ অফিসারদের আরও দীর্ঘ সময় সিলেটে ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি ছিল। তাঁকে এভাবে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়ায় আমরা সিলেটের নাগরিক সমাজ গভীরভাবে মর্মাহত। আমরা সরকারের সর্বোচ্চ মহলের কাছে জোর দাবি জানাই, এই বদলির প্রকৃত কারণ অবিলম্বে জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। একই সুর মিলিয়ে সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকরামুল কবির বলেন, মাজার কেন্দ্রিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙা এবং মাফিয়াদের স্বার্থে আঘাত লাগাই শেষ পর্যন্ত এই সৎ মানুষটির প্রধান অপরাধ হয়ে দাঁড়ালো কিনা, দেশের বুদ্ধিজীবী ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
পরিশেষে এই সত্যটি আমাদের মানতেই হবে যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতনভুক্ত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যখন খাঁটি জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অদৃশ্য শক্তির ইশারায় বদলির শিকার হন, তখন দেশের সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই এক চরম হতাশা ও প্রশ্ন জাগে— এই স্বাধীন রাষ্ট্রের আসল মালিক কারা? গুটিকয়েক প্রভাবশালী মাফিয়া সিন্ডিকেট নাকি দেশের সাধারণ জনগণ? বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সারওয়ার আলমের মতো সৎ, সাহসী, নির্লোভ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাঁদের যদি এভাবে একের পর এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মাঠ প্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে প্রশাসনে শুদ্ধাচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অবাস্তব ও অসম্ভব রূপ নেবে। সারওয়ার আলমের এই আকস্মিক বদলি কেবল একজন সাধারণ সরকারি কর্মকর্তার বদলি নয়, বরং এটি দেশের আমলাতন্ত্রে সততা, ন্যায় ও নৈতিকতার বিরুদ্ধে এক চরম অশনিসংকেত। সরকারের কাছে দেশের সাধারণ জনগণের এখন একটাই আকুল দাবি— সৎ অফিসারদের কাজের উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দিন, মেধার ভিত্তিতে তাঁদের মূল্যায়ন করুন, বদলির নামে এমন পরোক্ষ শাস্তি বন্ধ করুন। তা না হলে দেশের দুর্নীতিবাজরা আরও বেশি উৎসাহিত হবে এবং দিন শেষে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও দেউলিয়া হবে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ রাষ্ট্র।
আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি—সিলেটের অত্যন্ত দক্ষ ও জনবান্ধব জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমকে পুনরায় সিলেটের ডিসি হিসেবে সসম্মানে নিয়োগ দেওয়া হোক।
আকাশজমিন/ আরআর