২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের পর ২০২৬ সালের আমেরিকার বিশ্বকাপ—চারটি বছর কেটে গেলেও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে বিতর্কের সুর সেই একই রয়ে গেছে। বিশ্বকাপ বা বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এলেই পর্তুগিজ এই মহাতারকাকে নিয়ে ফুটবল বোদ্ধাদের মুখে একটিই কমন বুলি শোনা যায়, ‘এবার রোনালদোকে বাদ দাও’ কিংবা ‘তাঁকে সাইডবেঞ্চে বসিয়ে রাখো’। আমেরিকার মাটিতে চলমান ছাব্বিশের বিশ্বকাপেও ফুটবল দুনিয়ায় ঠিক একই সুর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন হলো, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই মহাতারকাকে দল থেকে পুরোপুরি ছেঁটে ফেলা কি আদৌ যুক্তিযুক্ত? ফুটবল বোঝেন এমন যেকোনো নিরপেক্ষ দর্শক একবাক্যে উত্তর দেবেন যে, রোনালদোকে স্কোয়াড থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হবে একটি নিশ্চিত ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত। তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়া সমাধান নয়; বরং দলের স্বার্থে তাঁকে ম্যাচের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খেলানো উচিত। আর পর্তুগালের প্রধান কোচকে অবশ্যই নিখুঁতভাবে বুঝতে হবে, ঠিক কতক্ষণ পর্যন্ত রোনালদোকে মাঠে রাখা দলের জন্য কার্যকর।
চলমান বিশ্বকাপে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে সিআরসেভেন (CR7) ছিলেন পুরোপুরি নিষ্প্রভ। পুরো নব্বই মিনিটে তিনি প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে মাত্র তিনটি শট নিলেও তার একটিও লক্ষ্যভেদী ছিল না। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ডি-বক্সে তাঁকে সতীর্থদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে এবং পুরো ম্যাচ জুড়ে মাঠে থেকেও তিনি দলের খেলায় কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেননি। পর্তুগালের এমন হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পরই বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে—রোনালদো অফ-ফর্মে থাকার পরও কেন কোচ তাঁকে পুরো সময় মাঠে খেলিয়ে গেলেন?
ঠিক একই সময়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, আর্লিং হালান্ড, লামিনে ইয়ামাল কিংবা হ্যারি কেনের মতো বিশ্বসেরা স্ট্রাইকাররা গোল করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। সেখানে রোনালদোর এমন ছায়া হয়ে থাকা পারফরম্যান্স ভক্তদের চরম হতাশ করেছে। তবুও পর্তুগিজ কোচ রবার্তো মার্তিনেজ বরাবরের মতোই তাঁর প্রিয় অধিনায়কের পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন। ম্যাচ শেষে মার্তিনেজ বলেন, “যে ম্যাচে দলের গোল পাওয়া ভীষণ প্রয়োজন, সেই ম্যাচে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।”
তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, রোনালদোর এই গোলখরা কোনো সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বড় আসরগুলোতে তাঁর অফ-ফর্ম দীর্ঘদিনের। আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় মঞ্চে তিনি এখন টানা ১০টি ম্যাচে সম্পূর্ণ গোলহীন। বিশ্বকাপ বা ইউরোর মতো মেগা আসরে পর্তুগালের হয়ে ওপেন-প্লে থেকে তাঁর সর্বশেষ গোলটি এসেছিল সেই ২০২১ সালের ইউরো কাপে, ফ্রান্সের বিপক্ষে।
ইউরোর বাছাইপর্ব কিংবা ফুটবলের অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রোনালদো নিয়মিত গোল উৎসব করলেও, বৈশ্বিক ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসল মঞ্চে সিআরসেভেনকে অনেক দিন ধরেই তাঁর চেনা ধারালো ও বিধ্বংসী রূপে দেখা যাচ্ছে না। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্নটা রোনালদোকে দল থেকে বাদ দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে নয়। বরং মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—দলের বৃহত্তর স্বার্থে এবং ম্যাচের জটিল সমীকরণে প্রয়োজন হলে রোনালদোকে কখন মাঠ থেকে তুলে নিতে হবে, সেই কঠিন ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিক জোর কি কোচ মার্তিনেজ দেখাতে পারবেন? চলতি বিশ্বকাপে পর্তুগালের শিরোপা জয়ের ভাগ্য এখন অনেকটাই নির্ভর করছে মার্তিনেজের সেই কঠিন সিদ্ধান্তের ওপর।