ক্রীড়া ডেস্ক:
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘ফিফা বিশ্বকাপ’ মানেই রেকর্ড ভাঙা-গড়ার এক রোমাঞ্চকর মঞ্চ। উত্তর আমেরিকা মহাদেশে চলমান ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপেও এর ব্যতিক্রম ঘটছে না। এবারের আসরে ফুটবলপ্রেমীরা মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি সাক্ষী হচ্ছেন এক অনন্য ইতিহাসের, যেখানে একদিকে মাঠ মাতাচ্ছেন ফুটবল ইতিহাসের প্রবীণতম মহাতারকারা, অন্যদিকে নিজেদের জাত চেনাচ্ছেন উদীয়মান তরুণ বিস্ময়বালকেরা। বয়সকে স্রেফ একটি সংখ্যা প্রমাণ করে যেমন সবুজ গালিচায় ঝড় তুলছেন অভিজ্ঞ ফুটবলাররা, তেমনই বয়সের ফ্রেমে বন্দি না থেকে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন নতুন প্রজন্মের প্রতিভারা। আন্তর্জাতিক ফুটবল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাঠের এই নবীন-প্রবীণের মেলবন্ধন এবারের বিশ্বকাপকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী বা প্রবীণতম খেলোয়াড় হিসেবে খেলার অনন্য রেকর্ডটি এখনো নিজের দখলে রেখেছেন মিশরের কিংবদন্তি গোলরক্ষক এসাম এল-হাদারি। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে যখন তিনি মাঠে নেমেছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৪৫ বছর ১৬১ দিন। এই তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন কলম্বিয়ার সাবেক গোলরক্ষক ফারিদ মন্দ্রাগন, যিনি ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ৪৩ বছর ৩ দিন বয়সে মাঠে নেমেছিলেন। আর ফরোয়ার্ডদের মধ্যে শীর্ষস্থানে আছেন ক্যামেরুনের রজার মিলা, যিনি ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ৪২ বছর ৩৯ দিন বয়সে খেলে ইতিহাস গড়েছিলেন। চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে এই প্রবীণদের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছেন স্কটল্যান্ডের ৪৩ বছর বয়সী গোলরক্ষক ক্রেইগ গর্ডন এবং পর্তুগালের মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর ১৩২ দিন বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড রোনালদো বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে উদ্বোধনী ম্যাচেই এক নতুন রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন।
প্রবীণদের এই দাপটের বিপরীতে বিশ্বকাপের মঞ্চ কাঁপানো কনিষ্ঠ বা সবচেয়ে কম বয়সী তরুণদের ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হওয়ার গৌরব অর্জন করে রেখেছেন নর্দান আয়ারল্যান্ডের নরম্যান হোয়াইটসাইড। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে যখন তাঁর আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর ৪১ দিন। এই তালিকায় ১৭ বছর ৯৯ দিন বয়স নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছেন ক্যামেরুনের সামুয়েল ইতো এবং ১৭ বছর ১০১ দিন বয়স নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন নাইজেরিয়ার ফেমি ওপাবুনমি। এরপর যথাক্রমে রয়েছেন ক্যামেরুনের সলোমন ওলেম্বে (১৭ বছর ১৮৫ দিন) এবং ব্রাজিলের ফুটবল সম্রাট পেলে (১৭ বছর ২৩৫ দিন)। উল্লেখ্য, ফুটবল সম্রাট পেলে এখনো পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা, সর্বকনিষ্ঠ হ্যাটট্রিককারী এবং বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে নিজের কীর্তি ধরে রেখেছেন।
ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলমান ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপেও একঝাঁক অনূর্ধ্ব-২০ বা টিনএজার ফুটবলার ফুটবল বিশ্বে নিজেদের আগমনী বার্তা জানান দিচ্ছেন। এবারের আসরের সবচেয়ে কনিষ্ঠ বা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন স্বাগতিক মেক্সিকোর ১৭ বছর ২৪০ দিন বয়সী তরুণ মিডফিল্ডার গিলবার্তো মোরা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে বিশ্বমঞ্চে তাঁর রাজকীয় অভিষেক ঘটে। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন চেক প্রজাতন্ত্রের ১৮ বছর ৪ দিন বয়সী তরুণ হুগো সোচুরেক। জার্মানির উদীয়মান তারকা লেনার্ট কার্ল ১৮ বছর ১০৯ দিন বয়স নিয়ে কনিষ্ঠদের তালিকায় তৃতীয় স্থান দখল করেছেন। এছাড়া সেনেগালের ১৮ বছর ১৩৮ দিন বয়সী ফরোয়ার্ড ইব্রাহিম এমবায়ে ফ্রান্সের বিপক্ষে চমৎকার এক গোল করে এই বিশ্বকাপের অন্যতম কনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লেখান। মিশরের ১৮ বছর ১৬১ দিন বয়সী তরুণ হামজা আবদেলকারিম এবং স্পেনের ১৮ বছর বয়সী বর্তমান ফুটবল বিস্ময় লামিন ইয়ামালও এবারের বিশ্বকাপে মাঠ মাতিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের দারুণ প্রশংসা কুড়াচ্ছেন।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট ‘ফিফা বিশ্বকাপ’ মানেই নতুন ইতিহাস সৃষ্টি আর পুরনো রেকর্ড ভাঙার রোমাঞ্চকর মঞ্চ। ফুটবল মহাযজ্ঞের দীর্ঘ ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, মাঠের লড়াইয়ে যেমন বয়সের ফ্রেমে বন্দি না থেকে প্রবীণ খেলোয়াড়রা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার দ্যুতি ছড়িয়েছেন, তেমনই মাত্র ১৭-১৮ বছর বয়সেই সবুজ গালিচায় বিস্ময় জাগিয়েছেন বিশ্বসেরা তরুণ প্রতিভারা। ২০২৬ সালের চলমান যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বিশ্বকাপেও আমরা দেখেছি ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা ১৭ বছর বয়সী মেক্সিকান বিস্ময়বালক গিলবার্তো মোরার দুর্দান্ত পদচারণা।
পাঠকদের জন্য ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের শীর্ষ ৫ প্রবীণতম এবং শীর্ষ ৫ কনিষ্ঠতম ফুটবলারদের অফিসিয়াল পরিসংখ্যানগত তালিকা নিচে উপস্থাপন করা হলো:
বিশ্বকাপের
ইতিহাসে শীর্ষ ৫ প্রবীণতম (বয়স্ক)
খেলোয়াড়
বিশ্বকাপের মঞ্চে গোলরক্ষকদের দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তবে এই তালিকায় একজন ফরোয়ার্ডের নামও জ্বলজ্বল করছে, যিনি ৪২ বছর বয়সেও গোল করে ইতিহাস গড়েছিলেন।
| ক্র. নং | খেলোয়াড়ের নাম | দেশ | পজিশন | বয়স (ম্যাচের দিন) | প্রতিপক্ষ ও বিশ্বকাপ আসর |
| ১. | এসাম এল-হাদারি | মিশর | গোলরক্ষক | ৪৫ বছর ১৬১ দিন | সৌদি আরব (২০১৮) |
| ২. | ফারিদ মন্দ্রাগন | কলম্বিয়া | গোলরক্ষক | ৪৩ বছর ৩ দিন | জাপান (২০১৪) |
| ৩. | রজার মিলা | ক্যামেরুন | ফরোয়ার্ড | ৪২ বছর ৩৯ দিন | রাশিয়া (১৯৯৪) |
| ৪. | প্যাট জেনিংস | নর্দান আয়ারল্যান্ড | গোলরক্ষক | ৪১ বছর ০ দিন | ব্রাজিল (১৯৮৬) |
| ৫. | পেন শীলটন | ইংল্যান্ড | গোলরক্ষক | ৪০ বছর ২৯২ দিন | ইতালি (১৯৯০) |
দ্রষ্টব্য: চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ৪১ বছর ১৩২ দিন বয়সে খেলতে নেমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক 'আউটফিল্ড' (গোলরক্ষক বাদে) খেলোয়াড় হিসেবে নতুন রেকর্ড বুকে নাম লিখিয়েছেন।
বিশ্বকাপের
ইতিহাসে শীর্ষ ৫ কনিষ্ঠতম (কম
বয়সী) খেলোয়াড়
| ক্র. নং | খেলোয়াড়ের নাম | দেশ | পজিশন | বয়স (অভিষেকের দিন) | প্রতিপক্ষ ও বিশ্বকাপ আসর |
| ১. | নরম্যান হোয়াইটসাইড | নর্দান আয়ারল্যান্ড | ফরোয়ার্ড | ১৭ বছর ৪০ দিন | যুগোস্লাভিয়া (১৯৮২) |
| ২. | সামুয়েল ইতো | ক্যামেরুন | ফরোয়ার্ড | ১৭ বছর ৯৮ দিন | ইতালি (১৯৯৮) |
| ৩. | ফেমি ওপাবুনমি | নাইজেরিয়া | উইঙ্গার | ১৭ বছর ১০০ দিন | ইংল্যান্ড (২০০২) |
| ৪. | সলোমন ওলেম্বে | ক্যামেরুন | মিডফিল্ডার | ১৭ বছর ১৮৪ দিন | অস্ট্রিয়া (১৯৯৮) |
| ৫. | পেলে | ব্রাজিল | ফরোয়ার্ড | ১৭ বছর ২৩৪ দিন | সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯৫৮) |
দ্রষ্টব্য: তালিকায় ৫ম স্থানে থাকলেও ফুটবল সম্রাট পেলে এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা, সর্বকনিষ্ঠ হ্যাটট্রিককারী এবং বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার (১৭ বছর ২৪৯ দিন) হিসেবে বিশ্ব রেকর্ড এককভাবে ধরে রেখেছেন। এছাড়া চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর ১৭ বছর ২৪০ দিন বয়সী গিলবার্তো মোরা এই তালিকার ঠিক পরেই (ষষ্ঠ স্থানে) জায়গা করে নিয়েছেন।
আকাশজমিন / আরআর