ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

দুর্নীতি ও অহংকারে ডুবছে প্রশাসন

৪০ কোটির পাসপোর্ট কর্তা বহাল, সৎ ডিসি ৩ মাসেই বদলি


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২৫ জুন, ২০২৬ সময় : ৯:২৬ পিএম

আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি

রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন কিংবা সরকারের নীতিগত রূপান্তর ঘটলেও দেশের শাসনযন্ত্রে জেঁকে বসা দুর্নীতিবাজ চক্রের চরিত্র ও প্রভাব অপরিবর্তিতই থেকে যাচ্ছে। ক্ষমতার পালাবদলে কেবল তাদের আনুগত্যের চাদরটি বদলায়, কিন্তু অনৈতিক পন্থায় অর্থ উপার্জনের চিরচেনা উৎসব বন্ধ হয় না। দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি দপ্তরেই কমবেশি নাগরিক হয়রানি ও দুর্নীতির অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকলেও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অনিয়ম যেন সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। এর সমান্তরালে ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং কাস্টমসের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও জনভোগান্তির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ আমলারা এই অসাধু চক্রকে আড়াল করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন, যার ফলে নতুন সরকারের আগমনে এরা ভোল বদলে পুনরায় ক্ষমতার কাছাকাছি জায়গা করে নেয় এবং নিজেদের অবৈধ সাম্রাজ্যকে আরও সুরক্ষিত করে তোলে।

সীমাবদ্ধ আয়ের চাকুরে হয়েও বিপুল বৈভবের মালিক বনে যাওয়ার এক নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পাসপোর্ট অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আইয়ুব আলী। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তার মাসিক সর্বসাকুল্যে বেতন এক লাখ টাকার বেশি না হলেও তার এবং তার স্ত্রীর নামে গড়ে ওঠা সম্পদের পাহাড় দেখে সাধারণ মানুষের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার গুলশান-২ এলাকায় আট কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, বনানী ডিওএইচএসে ছয় কোটি টাকার আবাসনসহ উত্তরা ও পূর্বাচলে কোটি কোটি টাকা মূল্যের প্লট রয়েছে এই কর্মকর্তার। নিজ জেলা শহরে ১৫ কাঠা জমির ওপর প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন এক দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেক্স বাড়ি।

শুধু তাই নয়, তার স্ত্রীর নামে রয়েছে প্রায় ১২০ বিঘা কৃষি ও বাণিজ্যিক জমি, যার আনুমানিক বাজারমূল্য সাত কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকের ১৪টি অ্যাকাউন্টে জমা রয়েছে প্রায় ছয় কোটি টাকার স্থায়ী আমানত ও নগদ অর্থ। এর বাইরেও স্ত্রীর নামে দুটি ট্রাভেল এজেন্সি, অভিজাত রেস্তোরাঁর মালিকানা, পাঁচটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দূরপাল্লার বাসসহ ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য রয়েছে ল্যান্ড ক্রুজার প্রাডো এবং হ্যারিয়ার জিপের মতো বহুমূল্যবান গাড়ি।

অনুসন্ধানে প্রকাশ, এই বিপুল সম্পদের পেছনে রয়েছে ‘আইয়ুব সিন্ডিকেট’ নামক এক শক্তিশালী ও নিয়মতান্ত্রিক ঘুষের নেটওয়ার্ক। সাধারণ গ্রাহকদের জিম্মি করে দ্রুততম সময়ে পাসপোর্ট পাইয়ে দেওয়ার নামে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, পুলিশি তদন্ত বা ভেরিফিকেশনের নামে ৩০ হাজার টাকা এবং পাসপোর্টের তথ্য সংশোধনের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। এই চক্রের স্বেচ্ছাচারিতায় প্রবাসগামী সাধারণ শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিকেরা প্রতিনিয়ত চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এমন সুনির্দিষ্ট ও চোখ কপালে তোলার মতো দুর্নীতির খতিয়ান উন্মোচিত হওয়ার পরও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রহস্যজনক ভূমিকা পালন করছে। জনশ্রুতি রয়েছে, সরকারের প্রভাবশালী মহলের শীর্ষনেতা ও আমলাতন্ত্রের নীতিনির্ধারকদের নিয়মিত মাসোহারা ও উপঢৌকন দিয়ে ম্যানেজ করার কারণেই তিনি আজ অবধি ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।

বিপরীত চিত্রে দেখা যায়, দেশের प्रशासनिक ব্যবস্থায় সততা ও সাহসিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া কর্মকর্তাদের কপালে জুটছে অনাকাঙ্ক্ষিত শাস্তি ও দ্রুত বদলি। কুষ্টিয়া জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব মোঃ ইকবাল হোসেন কর্মক্ষেত্রে সততার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়ার কারণে মাত্র তিন মাসের মাথায় তাকে আকস্মিকভাবে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

একইভাবে সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক জনাব মোঃ সারোয়ার আলম নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর কোয়ারি রক্ষা এবং সিলেট মহানগরীকে হকারমুক্ত করার প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের কোটি কোটি টাকার আর্থিক হিসাব তলব করাই যেন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০ মাসের মধ্যে তাকে ওএসডি তুল্য করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। এই ঘটনাগুলো মাঠ প্রশাসনে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, সৎ ও নিষ্ঠাবানদের জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কতটুকু ভঙ্গুর, যেখানে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত অনেক জেলা প্রশাসক বছরের বছর একই কর্মস্থলে বহাল তবিয়তে রাজত্ব করছেন।

প্রশাসন ক্যাডারের সর্বনিম্ন স্তর থেকে শুরু করে সচিবালয়ের উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের মধ্যে তীব্র অহংবোধ ও ঔপনিবেশিক মানসিকতা দৃশ্যমান। অবশ্য এর ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, অনেক সৎ ও জনবান্ধব কর্মকর্তা এখনো শ্রদ্ধার সাথে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে এক শ্রেণীর কর্মকর্তার আচরণে মনে হয় তারা যেন জনগণের মুখোমুখি জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। সম্প্রতি এক এসি ল্যান্ডকে এক নাগরিকের বৈধ কাজের প্রয়োজনে যোগাযোগ করা হলে তার প্রথম প্রশ্নই ছিল, "আপনি কি বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা?" এমন আচরণ প্রমাণ করে যে, সাধারণ নাগরিকদের তারা মানুষ বলেই গণ্য করতে চান না। একইভাবে মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কে জরুরি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে সাতবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে যে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি কর্তব্য’। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো, যেখানে সেবকেরা নিজেদের অধিপতি আর জনগণকে দাস মনে করেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকার ও জাতীয় সংসদের প্রতি কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো দাবি উঠছে। প্রথমত, জনাব মোঃ ইকবাল হোসেন এবং জনাব মোঃ সারোয়ার আলমের মতো সৎ ও সাহসী কর্মকর্তাদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ ও পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বদলি বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উপ-পরিচালক আইয়ুব আলীর মতো চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের অবিলম্বে সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে ৩০ দিনের মধ্যে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে।

তৃতীয়ত, জাতীয় সংসদের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে "সরকারি কর্মচারী আচরণ ও জবাবদিহিতা আইন-২০২৬" পাস করা সময়ের দাবি। এই আইনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে যে, অফিস চলাকালীন সময়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ফোন রিসিভ করা বাধ্যতামূলক এবং তা অমান্য করলে অসদাচরণের দায়ে বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। পাশাপাশি কোনো নাগরিকের সাথে অপেশাদার বা অহংকারমূলক আচরণ করলে জরিমানা ও বিভাগীয় মামলার বিধান রাখতে হবে এবং প্রতিটি জেলায় ‘কর্মকর্তা দুর্ব্যবহার প্রতিকার সেল’ গঠন করতে হবে, যেখানে বছরে অন্তত দুইবার প্রকাশ্য গণশুনানির মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।

সর্বশেষ, পাসপোর্ট, ভূমি ও বিআরটিএ-র মতো সেবা খাতগুলোকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি এই দ্বৈত নীতি বন্ধ না হয়, তবে রাষ্ট্রে সততা বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং দুর্নীতিই সফলতার মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর