শূন্য-শূন্য। স্কোরবোর্ড বলছে ড্র। কিন্তু মাঠের গল্প বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। কারণ পুরো ম্যাচে পর্তুগালকে ছাপিয়ে গেছে কলম্বিয়া। পরিসংখ্যানই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কলম্বিয়ার শট ছিল ২৬টি। পর্তুগালের মাত্র ১৩টি। অর্থাৎ, আক্রমণে দ্বিগুণ এগিয়ে ছিল দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। টার্গেটে শট? কলম্বিয়া ৬। পর্তুগাল মাত্র ২। যে দলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নার্দো সিলভা, ভিতিনিয়া, জোয়াও নেভেস আছে, সেই দল নব্বই মিনিটে মাত্র দুইবার প্রতিপক্ষ গোলরক্ষককে সত্যিকারের পরীক্ষা নিতে পেরেছে! এটাই কি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার ফুটবল? বল দখলেও পিছিয়ে পর্তুগাল। কলম্বিয়ার পজেশন ছিল ৫৫ শতাংশ। পর্তুগালের মাত্র ৪৫। হ্যাঁ, পর্তুগালের পাস অ্যাকুরেসি ছিল ৯৩ শতাংশ। দেখতে দারুণ শোনায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই পাসগুলো কোথায় গেছে? সামনে? নাকি শুধু নিজেদের ডিফেন্স আর মিডফিল্ডেই ঘুরেছে? কারণ ৯৩ শতাংশ নিখুঁত পাস দিয়েও যদি পুরো ম্যাচে মাত্র দুইটি শট অন টার্গেট হয়, তাহলে সেই পরিসংখ্যানের কোনো মূল্য নেই। ফুটবল match জেতা হয় গোল করে। পাসের শতাংশ দিয়ে নয়। আর এখানেই পর্তুগালের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই দলে আছে ইউরোপের সেরাদের সেরা কিছু ফুটবলার। নুনো মেন্দেস, ভিতিনিয়া ও জোয়াও নেভেস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী এই ফুটবলাররা ক্লাব পর্যায়ে আধিপত্য দেখিয়েছেন। অন্যদিকে আছেন ব্রুনো ফার্নান্দেজ। যিনি চলতি মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে একের পর এক রেকর্ড গড়েছেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পুরো আক্রমণভাগ একাই টেনে নিয়েছেন কাঁধে। তবুও জাতীয় দলের জার্সিতে সেই আগুনটা কোথায়? কোথায় সেই নেতৃত্ব? কোথায় সেই সৃজনশীলতা? আরও অবাক করার বিষয়— ৩৪ বছর বয়সী সান্তিয়াগো আরিয়াস যেন সময়কে পেছনে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।
একসময়ের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের এই ডিফেন্ডার পুরো ম্যাচে অসাধারণ শৃঙ্খলা দেখিয়েছেন। তার অভিজ্ঞতার সামনে পর্তুগালের তারকারা বারবার আটকে গেছেন। আর জোন আরিয়াস? ম্যাচের অন্যতম সেরা ফুটবলার। গতি, ড্রিবলিং, প্রেসিং, সৃজনশীলতা— সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন কলম্বিয়ার আক্রমণের প্রাণ। এখন প্রশ্নটা খুব সহজ। একদিকে— রোনালদো, ব্রুনো, বার্নার্দো, ভিতিনিয়া, নেভেস, রুবেন দিয়াস। অন্যদিকে— সান্তিয়াগো আরিয়াস, জোন আরিয়াস, হামেস রদ্রিগেজ। কিন্তু ম্যাচের সেরা ফুটবলটা খেলেছে কারা? উত্তরটা নিশ্চয়ই পর্তুগাল সমর্থকদের পছন্দ হবে না। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো— কলম্বিয়ার একটি গোল অফসাইডে বাতিল হয়েছে। মাত্র কয়েক ইঞ্চির ব্যবধানে বেঁচে গেছে পর্তুগাল। অন্যদিন হলে? হয়তো পরাজয় নিয়েই মাঠ ছাড়তে হতো। কখনো কখনো এই পরিসংখ্যান একটা বিষয় স্পষ্ট করে— এক দল জয়ের জন্য লড়েছে।
অন্য দল শুধু ম্যাচটা পার করতে চেয়েছে। বিশ্বকাপ জিততে হলে শুধু সুন্দর ফুটবল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ক্ষুধা। প্রয়োজন আগ্রাসন। প্রয়োজন লড়াই করার মানসিকতা। সামনে অপেক্ষা করছে ক্রোয়েশিয়া। তারপর হয়তো স্পেন। এরপর বেলজিয়াম, ফ্রান্স কিংবা ব্রাজিল। যদি এই একই পর্তুগাল মাঠে নামে, তাহলে তাদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যেতে পারে। কারণ বিশ্বকাপে নাম দেখে কেউ জেতে না। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মেডেল দেখিয়েও ট্রফি পাওয়া যায় না। বিশ্বকাপ জিততে হলে মাঠে প্রতিপক্ষকে বিশ্বাস করাতে হয়— তুমি তাদের চেয়ে ভালো।
আর কলম্বিয়ার বিপক্ষে অন্তত সেই কাজটা করতে পারেনি পর্তুগাল। বরং পুরো বিশ্বকে একটা প্রশ্ন উপহার দিয়েছে— এই ফুটবল খেলে, সত্যিই কি পর্তুগাল বিশ্বকাপ জিততে পারবে? ইউরোপের অন্যতম সেরা ও ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড নিয়েও মাঠের পারফরম্যান্সে এমন দৈন্যদশা চরম হতাশার। বড় টুর্নামেন্টে নামার আগে নিজেদের রণকৌশল নতুন করে না সাজালে পর্তুগালের এই সোনালী প্রজন্মের ট্রফি জয়ের স্বপ্ন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।