ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

ঐতিহ্য বনাম বিবর্তন: সেলেসাওদের ছন্দের সামনে আজ লড়াকু ‘ব্লু সামুরাই’


  • আপলোড সময় : সোমবার ২৯ জুন, ২০২৬ সময় : ৬:৫৮ পিএম

ক্রীড়া প্রতিবেদক 

বাংলাদেশে আজ লাখো মানুষ ব্রাজিলের জন্য মন থেকে দোয়া করবেন। হাজার হাজার ভক্ত হলুদ-সবুজ জার্সি পরে টেলিভিশনের সামনে বসবেন, পাড়ায় পাড়ায় টাঙানো হবে বড় পর্দা। এদেশে ব্রাজিলের খেলা মানে তো কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ নয়—এটি এক পরম সামাজিক উৎসব, এক অনাবিল আবেগ। এ দেশের বহু মানুষের শৈশব, কৈশোর আর ফুটবল-ভালোবাসার প্রথম রঙটাই হলো হলুদ-সবুজ।

তবুও, আজকের এই মহাগুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচের আবেগের ভেতরে কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম অন্যরকম টান লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশের আপামর সেলেসাও ভক্তরা মনেপ্রাণে চাইবেন ব্রাজিলই জিতুক। কিন্তু যারা ফুটবলকে একটু গভীরভাবে দেখেন, তারা হয়তো চাইবেন না যে জাপান দলটা আজ হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিক। কারণ, এবারের বিশ্বকাপে ব্লু সামুরাইরা এমন নান্দনিক ও পরিকল্পিত ফুটবল উপহার দিয়েছে যে, এই মুহূর্তে তাদের বিদায় মানে শুধু একটি দলের পরাজয় নয়—ফুটবল মানচিত্রে গড়ে ওঠা এক রূপকথার গল্পের অকাল অবসান।

ম্যাচের আগে দুই দলের সাম্প্রতিক পথচলার দিকে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যায়, ব্রাজিল কাগজে-কলমে পরিষ্কার ফেবারিট হলেও জাপানকে অবহেলা করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। ব্রাজিল গ্রুপ পর্বে ৭ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে থেকেই নকআউটের টিকিট কেটেছে। মরক্কোর সঙ্গে ১-১ ড্র দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু হয়েছিল, তবে পরের দুই ম্যাচেই চেনা ছন্দে ফিরে হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে সমান ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয় তারা। ৩ ম্যাচে ৭ গোল করার বিপরীতে সেলেসাওরা হজম করেছে মাত্র ১টি। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য এমন পরিসংখ্যান নতুন কিছু নয়, তবে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কাছে ভক্তদের প্রত্যাশা শুধু জয় নয়, বরং জোগো বোনিতোর ছন্দ। প্রথম ম্যাচের সেই অস্বস্তি কাটিয়ে শেষ দুই ম্যাচে টানা বড় জয় প্রমাণ করেছে যে, ভিনিসিয়ুস-রদ্রিগোরা নিজেদের চেনা গতি ও সামর্থ্যে ফিরছেন।

কিন্তু জাপানের পরিসংখ্যানও কোনো অংশে কম কথা বলছে না। গ্রুপ পর্বে তারা অপরাজেয় থেকে মাঠ ছেড়েছে। ইউরোপীয় পরাশক্তি নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ২-২ ড্র, তিউনিসিয়ার বিপক্ষে ৪-০ গোলের দাপুটে জয় এবং শক্তিশালী সুইডেনের সঙ্গে ১-১ ড্র। ৩ ম্যাচে তাদের গোলসংখ্যাও ব্রাজিলের সমান ৭। শুধু গোল বা পয়েন্টের হিসাবে নয়, মাঠের ফুটবলে জাপান দেখিয়েছে আধুনিক রণকৌশল, নিখুঁত গতি, কঠোর শৃঙ্খলা আর বুকভরা সাহস। ইউরোপের দুই শীর্ষ শক্তির বিপক্ষে সমানে সমানে লড়ে ড্র এবং আফ্রিকার দলের বিপক্ষে বড় জয় প্রমাণ করে—জাপান এবার কেবল অংশগ্রহণ করতে নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়েই এসেছে।

তাই আজ রাতের এই লড়াই শুধু ব্রাজিল বনাম জাপান নয়; এটি আসলে ঐতিহ্য বনাম বিবর্তনের এক মহাকাব্যিক সংঘাত। একদিকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল—যাদের রয়েছে ৫টি সোনালী ট্রফি, অসংখ্য কিংবদন্তির রূপকথা আর ফুটবলের শৈল্পিক রূপের এক দীর্ঘ গৌরবময় ইতিহাস। অন্যদিকে লড়াকু জাপান—যারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা আর সুশৃঙ্খল ফুটবল-সংস্কৃতি গড়ে আজ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিও তাদের নিয়ে আলাদা করে ছক কষতে বাধ্য হচ্ছে।

বাংলাদেশে ব্রাজিলের সমর্থনের শেকড় অনেক গভীরে। বিশ্বকাপ এলেই এখানে শহর থেকে গ্রামে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকার জোয়ার বয়ে যায়। কেউ হয়তো পেলে-গারিঞ্চার গল্প শুনে, কেউ রোমারিও-বেবেতোর জাদুতে, কেউবা ২০০২ সালের রোনালদো-রিভালদো-রোনালদিনহোর ‘থ্রি আর’ ম্যাজিক দেখে এই দলের প্রেমে পড়েছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বদলেছে, নেইমারের ড্রিবলিং বা ভিনিসিয়ুসের গতিতেও তরুণরা মজেছে, কিন্তু সমর্থনের এই পরম্পরা একটুও ম্লান হয়নি।

তবে, এবারের বিশ্বকাপে আধুনিক ফুটবলপ্রেমী ব্রাজিল-সমর্থকদের মনেও জাপানের জন্য একটা আলাদা শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি হয়েছে। জাপানের ফুটবলে কোনো অহংকার নেই, মাঠের ভেতর অকারণ নাটকীয়তা বা সময় নষ্ট করার প্রবণতা নেই; আছে কেবল অটুট শৃঙ্খলা। বলের দখল পেলেই তারা ক্ষিপ্র গতিতে প্রতিপক্ষের বক্সে হানা দেয়, আবার বল হারালে চোখের পলকে দল বেঁধে নিজেদের ডিফেন্সে ফিরে আসে। হাই প্রেসিং, দ্রুত ট্রানজিশন, কম্বিনেশন প্লে আর নিখুঁত দলগত ভারসাম্য—আধুনিক ফুটবলের এই জটিল ব্যাকরণগুলো জাপান মাঠে খুব সহজভাবে করে দেখিয়েছে।

এই জাপানকে দেখে আজ পুরো এশিয়ার ফুটবলও বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর সাহস পায়। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বকাপে এশিয়ার দলগুলোকে কেবল ‘লড়াকু’ বা অনুমেয় দল হিসেবে দেখা হতো, শিরোপার দাবিদার হিসেবে নয়। জাপান সেই পুরনো ধ্যানধারণা ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের মতো পরাশক্তিদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে পয়েন্ট ছিনিয়ে নেওয়া তাদের মানসিকতা বদলের চূড়ান্ত প্রমাণ। আর ঠিক এই কারণেই আজ আমাদের মনে এমন দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি—চাওয়া একটাই, ব্রাজিল জিতুক, তবে জাপান যেন হেরেও না হারে।

ফুটবলের নিয়মে তো টাইব্রেকার বা অতিরিক্ত সময়ে যেকোনো এক দল জিতবে এবং অন্য দল বিদায় নেবে। কিন্তু সব পরাজয় তো এক নয়। কিছু হার মাথা নিচু করে বিদায় দেয়, আবার কিছু হার বিদায় দেয় বীরের বেশে, মাথা উঁচু করে। জাপান যদি আজ ব্রাজিলের বিশ্বসেরা আক্রমণের বিরুদ্ধে শেষ মিনিট পর্যন্ত বুক চিতিয়ে লড়াই করে, যদি তাদের সুসংগঠিত ফুটবল, গতি আর আত্মবিশ্বাস মাঠে ধরে রাখতে পারে, তবে স্কোরবোর্ডে তারা হারলেও বিশ্ববাসীর হৃদয়ে আসলে অপরাজিতই থেকে যাবে।

ব্রাজিলের জন্য আজকের এই ৯০ বা ১২০ মিনিটের পরীক্ষাটা মোটেও সহজ হবে না। ইতিহাস এবং ঐতিহ্য হয়তো সেলেসাওদের পক্ষে কথা বলছে, তবে সাম্প্রতিক স্মৃতি কিন্তু জাপানের পক্ষে। গত বছরের অক্টোবরে এক আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে এই জাপানই ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ব্রাজিলিয়ান ডাগআউটে থাকা অভিজ্ঞ কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাই জাপানকে যথেষ্ট সমীহ করছেন এবং তাদের প্রতি আক্রমণ ঠেকাতে বিশেষ পরিকল্পনা সাজিয়েছেন।

আজকের এই ব্লকবাস্টার ম্যাচের জন্য গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকবেন দেশের ফুটবলপ্রেমীরা। ব্রাজিল গোল করলে উল্লাসে ফেটে পড়বে বাংলাদেশের কোটি কোটি ঘর। কিন্তু জাপান যদি গোল খেয়েও মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে, শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত ছোট ছোট নিখুঁত পাস আর কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবলে ব্রাজিলকে চাপে রাখে, তবে সেটাই হবে ফুটবলের আসল সৌন্দর্য।

বাংলাদেশের ব্রাজিল-সমর্থকেরা নিশ্চয়ই চাইবেন তাদের প্রিয় দল কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটুক। তবে একজন নিরপেক্ষ ফুটবলপ্রেমী হিসেবে সবার মনে আরেকটি নীরব প্রার্থনাও থাকবে—জাপান যেন মাথা উঁচু করেই মাঠ ছাড়ে। স্কোরবোর্ডের অঙ্কে তাদের বিদায় হলেও, মাঠের নান্দনিক ফুটবলটা যেন হেরে না যায়। কারণ কিছু পরাজয় শুধু ইতিহাসের পাতায় ফলাফলের সংখ্যায় লেখা থাকে, মানুষের মনের মণিকোঠায় নয়। আজ তাই ফুটবলপ্রেমীদের চাওয়া একটাই—ব্রাজিল জিতুক, তবে জাপান যেন না হারে।

আকাশজমিন / আরআর 



এ সম্পর্কিত আরো খবর