ক্রীড়া প্রতিবেদক
ব্রাজিলের হয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে এই মুহূর্তে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন সেলেসাও তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ গোলটি করার পর হাইতির বিপক্ষেও জালের দেখা পান রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা উইঙ্গার। এরপর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে নান্দনিক জোড়া গোল করে চলতি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় ওপরের দিকে নিজের নাম তুলে নিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপে তাঁর এমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পরপরই রিয়াল মাদ্রিদ কর্তৃপক্ষ ভিনির চুক্তি নবায়নের (কনট্রাক্ট রিনিউ) প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে কাজ শুরু করেছে বলে ক্লাব সূত্রে জানা গেছে।
তবে মাঠের জাদুকরী পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ফুটবলবিশ্বে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা বর্ণবাদের (রসিজম) বিরুদ্ধে নিজের শক্ত অবস্থান নিয়ে আবারও স্পষ্ট কথা বলেছেন ভিনিসিয়ুস। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘মাঠের বাইরের এই অর্জনগুলো (বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই) আমার ফুটবলীয় অর্জনের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে আমি বিশ্বজুড়ে আরও লাখ লাখ শোষিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে পারি।’
ব্রাজিলিয়ান এই তারকা ফুটবলার মনে করেন, ফুটবল ও সমাজ থেকে বর্ণবাদ পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে এখনো অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই সমাজ ও গ্যালারির মানসিকতার পরিবর্তন খুব ধীরে হচ্ছে। তবে আমি মনেপ্রাণে আশা করি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যেন আমাদের মতো এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়। আমার নিজের সাত বছরের ছোট একটা ভাই আছে, আমি কখনোই চাই না যে সে-ও বড় হয়ে আমার মতো বর্ণবাদের নোংরা শিকার হোক।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি মাঠে ব্রাজিলের হয়ে বড় সাফল্য অর্জন করতে চাই, ঠিক একই সঙ্গে গ্যালারি বা মাঠের সেই তরুণ কৃষ্ণাঙ্গদের অনুপ্রাণিত করতে চাই, যাদের কণ্ঠস্বর সমাজ কিংবা ফুটবলের নীতিনির্ধারকদের কাছে আমার মতো এতটা জোরালো নয়।’
এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বর্তমান শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়েও ব্যাপক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ভিনিসিয়ুস। তাঁর ভাষায়, ‘এটি এমন একটি লড়াকু প্রজন্ম, যারা ব্রাজিলকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আবারও শীর্ষে ফিরিয়ে নিতে বুক চিতিয়ে লড়াই করছে। সেলেসাওদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপার (হেক্সা মিশন) অপেক্ষাটা এবার বড্ড দীর্ঘ হয়েছে। তবে বিগত সাম্প্রতিক বছরগুলোর ব্যর্থতা থেকে আমরা দলে অনেক কিছু শিখেছি।’
তিনি মনে করেন, অভিজ্ঞ কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে গোটা দল তাদের হারিয়ে যাওয়া চিরচেনা আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ফিরে পেয়েছে। ভিনি বলেন, ‘আনচেলত্তি আমাদের মাঠের ভেতর খেলার পূর্ণ স্বাধীনতা, মানসিক স্বস্তি এবং অটুট বিশ্বাস এনে দিয়েছেন যে— আমরা আবারও বিশ্বসেরাদের কাতারে রাজত্ব করতে পারি।’
দলে নেইমার জুনিয়র, কাসেমিরো, মারকিনিওস, দানিলো ও অ্যালেক্স সান্দ্রোর মতো অভিজ্ঞ ও হাইপ্রোফাইল ফুটবলারদের উপস্থিতি তরুণদের জন্য এক বিশাল বড় মানসিক সহায়তা বলে উল্লেখ করেন তিনি। ভিনির মতে, ‘তাদের বছরের পর বছর ধরে জমানো আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আমাদের মাঠে আরও স্বাধীন ও চাপহীনভাবে খেলতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এন্দ্রিক ও রায়ানের মতো তরুণ তুর্কিরাও দলে যোগ হয়ে নতুন এক গতির শক্তি জোগাচ্ছে।’
চলতি বিশ্বকাপে নিজের এমন চোখ ধাঁধানো ফর্মের পেছনের আসল রহস্য জানাতে গিয়ে ভিনিসিয়ুস বলেন, ‘বিশ্বকাপের আসর শুরুর আগেই আমি বলেছিলাম যে, আমি টেকনিক্যালি, শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে আমার ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করছি। পুরো ক্লাব মরশুম আমি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। কোনো বড় ইনজুরিতে পড়িনি, রিয়াল মাদ্রিদেরও কোনো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মিস করিনি। আপনি যত বেশি কঠোর পরিশ্রম করবেন, ভাগ্যও তত বেশি আপনার পক্ষে কথা বলবে।’
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে সচরাচর হেডে গোল না করা ভিনিসিয়ুস এবার হেড থেকে গোল করার প্রসঙ্গে হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমি সাধারণত হেডে গোল করি না। কোচের (আনচেলত্তি) সঙ্গে ম্যাচ শুরুর আগে এ নিয়ে আমার একটা বিশেষ বাজি ছিল। ক্যারিয়ারে আমি মাত্র দুই থেকে তিনটি গোল হেডে করেছি। এবার বাজি জেতার পর কোচের কাছ থেকে উপহারটা বেছে নেওয়ার পালা!’
আকাশজমিন / আরআর