আকাশপথ ও সড়কপথের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল রেলপথ। ‘মৈত্রী’, ‘বন্ধন’ ও ‘মিতালী’—এই তিনটি আন্তঃদেশীয় ট্রেনের মাধ্যমে দুই দেশের যাত্রীরা যাতায়াত করতেন। তবে বিগত প্রায় দুই বছর ধরে এই যাত্রীবাহী ট্রেন পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি গত ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের মেডিকেল ভিসার পাশাপাশি পর্যটন (ট্যুরিস্ট) ভিসাও পুনরায় চালু করা হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভ্রমণ ভিসা চালুর এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে, যার হাত ধরে আবারও আলোচনায় এসেছে দুই দেশের মধ্যকার বন্ধ থাকা রেল যোগাযোগ চালুর বিষয়টি। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—কবে আবার চালু হবে বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃদেশীয় ট্রেন?
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ট্রেন চলাচলের বিষয়ে ভারতীয় রেলওয়েকে পাঠানো সর্বশেষ চিঠির কোনো উত্তর এখনও আসেনি। নতুন করে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পাওয়া গেলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করা হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের মধ্যে ট্রেন চালুর বিষয়টি মূলত ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়া, পর্যাপ্ত যাত্রী সংখ্যা এবং এই সেবার বাণিজ্যিক লাভজনকতার ওপর নির্ভর করছে। এটি কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং পিওর ব্যবসায়িক বাস্তবতা ও দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। ভিসা শিথিল হয়ে যাত্রী সংখ্যা বাড়লে ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই দুই দেশ ট্রেন চালু করতে আগ্রহী হবে। অন্যদিকে, রেলপথ মন্ত্রণালয় ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এই যোগাযোগ পুনর্বহাল করার বিষয়ে খুব শীঘ্রই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।
কেন এবং কবে থেকে বন্ধ রয়েছে রেল যোগাযোগ?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাত্রীবাহী আন্তর্জাতিক ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছিল ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ দিয়ে। এটি ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে ভারতের কলকাতা রুটে প্রথম চালু হয়, যা দীর্ঘ ৪৩ বছর পর দুই দেশের রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করেছিল। এরপর ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর খুলনা-কলকাতা রুটে যাত্রা শুরু করে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’। সর্বশেষ ২০২১ সালের ২৬ মার্চ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর ভার্চ্যুয়াল উদ্বোধনের পর ২০২২ সালের ১ জুন বাণিজ্যিকভাবে চালু হয় ‘মিতালী এক্সপ্রেস’। এই ট্রেনটি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে ভারতের নিউ জলপাইগুড়ি (এনজেপি) পর্যন্ত চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথ ব্যবহার করে সরাসরি চলাচল করত।
তবে ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগ ধাপে ধাপে বন্ধ হয়ে যায়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই মৈত্রী এক্সপ্রেস, ১৭ জুলাই বন্ধন এক্সপ্রেস এবং ১৮ জুলাই মিতালী এক্সপ্রেসের চলাচল স্থগিত করা হয়। সেই থেকে বিগত প্রায় দুই বছর ধরে এই পরিষেবা বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পর দেশে আটকে থাকা ভারতীয় রেলওয়ের কোচ ও ওয়াগনগুলো অলরেডি ভারতে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
কী বলছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে?
রেলওয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে ট্রেন চলাচল নিয়ে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। আগের রুটগুলোর পাশাপাশি এবার মৈত্রী এক্সপ্রেসকে পদ্মা সেতু হয়ে চালানো যায় কি না, সেই বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে। এ বিষয়ে শুধু রেলপথ মন্ত্রণালয় নয়, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও যৌথভাবে কাজ করছে। এ প্রসঙ্গে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব জানান, ট্রেন চলাচলের বিষয়ে নতুন করে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হতে পারে। আলোচনা ফলপ্রসূ হলে তখনই ট্রেন চালুর সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যাবে।
তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এবং এই দুই বছরে বাংলাদেশে ডলারের দাম প্রায় ১৪ থেকে ১৫ টাকা বৃদ্ধি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ট্রেন চালু হলে ভাড়া আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ১৫ জুন শেষবারের মতো ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, মৈত্রী এক্সপ্রেসের এসি সিটের ভাড়া ৫,১১০ টাকা ও এসি চেয়ারের ভাড়া ৩,৭৪০ টাকা; বন্ধন এক্সপ্রেসের এসি সিট ৩,০৫৫ টাকা ও এসি চেয়ার ২,৩৭০ টাকা এবং মিতালী এক্সপ্রেসের এসি বার্থ ৭,০২৫ টাকা, এসি সিট ৪,৫২০ টাকা ও এসি চেয়ারের ভাড়া ৪,MDE৫ টাকা নির্ধারিত ছিল (যার মধ্যে মিতালী এক্সপ্রেসের এসি সিট বাদে বাকি সব ভাড়ায় ট্রাভেল ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত ছিল)। নতুন করে সমন্বয় করা হলে এই ভাড়া আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
পর্যটকদের প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
দীর্ঘ দুই বছর পর ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হলেও প্রথম দুই দিনে (২৮-২৯ জুন) রাজধানী ঢাকার মূল ভিসা আবেদন কেন্দ্রে (আইভ্যাক) প্রত্যাশিত ভিড় দেখা যায়নি। আবেদনকারীদের সিংহভাগই এসেছেন মেডিকেল ভিসা ও পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য। নতুন স্লটভিত্তিক আবেদন ব্যবস্থার কারণে আবেদন প্রক্রিয়া কিছুটা জটিল ও দীর্ঘায়িত হওয়ায় সাধারণ পর্যটকদের কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবেদনকারীরা।
দুই দেশের ট্রেন চালুর বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, রেল চালুর ক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠি হলো যাত্রীর সংখ্যা ও বাণিজ্যিক লাভ। ভিসা সহজ না হলে পর্যাপ্ত যাত্রী মিলবে না, আর লোকসান দিয়ে কোনো দেশই ট্রেন চালাবে না। এটিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে ব্যবসা ও পারস্পরিক সম্পর্কের জায়গা থেকে দেখা উচিত। ভিসা নীতি আরও শিথিল হলে এবং যাতায়াত বাড়লে উভয় দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থেই ট্রেন চালু করতে দুই দেশ সম্মত হতে বাধ্য হবে।