বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল জার্মানি। বিশেষ করে ম্যাচের দ্বিতীয় ভাগে মুহূর্মুহূ আক্রমণ শানিয়ে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরেছিল তারা। তবে মাঠের একাধিক ভুল আর ট্যাকটিক্যাল পরিকল্পনার গড়মিলে গোলের সংখ্যা আর বাড়েনি। ফলে ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে, যেখানে ইউরোপীয় জায়ান্টদের শক্তির ভাঙন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ম্যাচের পুরো ১২০ মিনিট জুড়ে দলটির পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে নয়, বরং নিজেদের পুঞ্জীভূত দুর্বলতার কারণেই এবার বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যেতে হয়েছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
জার্মানির এই আকস্মিক বিদায়ের নেপথ্যে প্রথমেই কাঠগড়ায় দাঁড়াবে তাদের রক্ষণভাগের চরম অগোছালো রূপ। ম্যাচের প্রথম গোলের সময় প্যারাগুয়ের জুলিও এনসিসো যেভাবে ডি-বক্সের ভেতর সম্পূর্ণ আনমার্কড অবস্থায় হেডে বল জালে জড়ালেন, তা জার্মান ডিফেন্সের পজিশনিং ও মনোযোগের কঙ্কালসার রূপটি উন্মুক্ত করে দেয়। এই এক গোলের মাধ্যমেই ডিফেন্ডারদের দায়সারা মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধারাবাহিকভাবে টানা ১০ ম্যাচে গোল হজম করার যে লজ্জাজনক রেকর্ড জার্মানি গড়েছে, তা মূলত এই ডিফেন্সিভ লাইনের ভঙ্গুরতারই অকাট্য প্রমাণ।
শুধু ডিফেন্স নয়, জার্মানির চিরাচরিত শক্তির জায়গা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণও এবার ছিল নড়বড়ে। মাঠে বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলেও সেই পজিশন থেকে কার্যকর বা ধারালো আক্রমণ তৈরি করার ক্ষেত্রে মিডফিল্ডারদের ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণে ওঠার গতি (ট্রানজিশন) এতটাই ধীরগতির ছিল যে, প্যারাগুয়ে ডিফেন্স খুব সহজেই নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যায়। সুযোগ যে একেবারে তৈরি হয়নি তা নয়, তবে ফাইনাল থার্ডে এসে চরম সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বারবার খেই হারিয়েছে জার্মান ফরোয়ার্ডরা।
দলের এই বিপর্যয়ের পেছনে ম্যানেজমেন্টের একাদশ নির্বাচনও বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নকআউটের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শুরুর একাদশে বড় পরিবর্তন এনে নতুন একটি ট্যাকটিক্যাল কাঠামো চেষ্টা করেছিলেন কোচ। তবে সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা মাঠে বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়; যার ফলে দলের আক্রমণ ও রক্ষণভাগের ভারসাম্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে বদলি খেলোয়াড় নামিয়ে খেলায় কিছুটা গতি ফিরলেও, ততক্ষণে ম্যাচের লাগাম পুরোপুরি নিজেদের হাতে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির জন্য সবচেয়ে বড় মানসিক ধাক্কা হয়ে আসে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি তথা ভিএআর (VAR) এর একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। ডিফেন্ডার জোনাথন তাহের নেওয়া একটি দুর্দান্ত হেড জয়সূচক গোল হিসেবে উদযাপিত হলেও ভিএআর প্রযুক্তির সাহায্যে তা বাতিল করে দেওয়া হয়। এই একটি সিদ্ধান্তই জার্মান শিবিরের মানসিক শক্তির ভিত নাড়িয়ে দেয়। এরপর চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা লড়াইয়ের চেষ্টা করলেও তাদের আক্রমণে সেই ধার বা আত্মবিশ্বাস আর দেখা যায়নি।
সবশেষে পেনাল্টি শুটআউট বা টাইব্রেকারেই জার্মানির স্নায়ুচাপ সামলানোর পুরোনো ঐতিহ্যের চিরতরে ভাঙন ধরে। ফুটবল ইতিহাসে যে জার্মানিকে টাইব্রেকারে সবচেয়ে নির্ভুল ও মানসিক দিক থেকে ইস্পাতকঠিন ধরা হতো, তারাই এবার চরম চাপের মুখে ভেঙে পড়ে। শুটআউটের গুরুত্বপূর্ণ শট মিস এবং একের পর এক ব্যর্থতায় ম্যাচটি তাদের হাত থেকে ফসকে প্যারাগুয়ের ঝুলিতে চলে যায়। স্পষ্টতই, কোনো অলৌকিক অঘটন নয়, বরং ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের করা ভুলগুলোর খেসারত দিয়েই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিল জার্মানি।