একটা সময় ছিল যখন মাঠের ভেতর যার উপস্থিতির জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকত পুরো দল। আর এখন ফুটবল ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে সেই চেনা মানুষটির দলে থাকাটাকেই নাকি বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে! ক্যারিয়ারের এই পড়ন্ত বিকেলে এমনই এক রূঢ় সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ফুটবল কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে। চলমান বিশ্বকাপে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করেও ফুটবলপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের মন পুরোপুরি জয় করতে পারছেন না তিনি। পর্তুগিজ এই মহাতারকার দলে থাকাটা পর্তুগালের সামগ্রিক কৌশলের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছেন তার এক সময়কার ক্লাব সতীর্থ ডিয়েগো ফোরলান।
২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের গোল্ডেন বলজয়ী উরুগুয়ের সাবেক তারকা স্ট্রাইকার ডিয়েগো ফোরলান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, রোনালদো এখনো তার পুরোনো আমলের স্টাইলেই ফুটবল খেলে যাচ্ছেন। বিশ্বখ্যাত ক্রীড়ামাধ্যম ইএসপিএনের ‘লা কাসা দেল কুন’ নামক এক বিশেষ অনুষ্ঠানে আলোচনা করতে গিয়ে ফোরলান বলেন, "একজন স্ট্রাইকার হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মূল সমস্যাটা হচ্ছে রোনালদো সবসময় সেন্টার পজিশনে দাঁড়িয়ে থাকে। সে এখন নিজেকে পুরোপুরি ‘নাম্বার নাইন’ পজিশনে আটকে রেখেছে এবং কেবল গোলের সুযোগের অপেক্ষায় ওখানেই ওত পেতে থাকে। বল কেড়ে নেওয়ার জন্য বা আক্রমণ গড়তে সে নিচে নেমে আসে না। আর এই বিষয়টিই মাঠের ভেতর পর্তুগালের আক্রমণভাগকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে।"
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে এক সময় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সাথে ২১টি ম্যাচ খেলা উরুগুয়ের এই স্ট্রাইকার আরও যোগ করেন, "এটি ঠিক সেই পুরোনো আমলের কৌশল যখন স্ট্রাইকাররা বলত—‘আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব, কারণ আমি গোল করার মতো সুবিধাজনক জায়গায় আছি।’ তবে আপনি এটা বুঝতে পারছেন না যে, এই একগুঁয়েমির ফলে দিনশেষে দলের বড় ক্ষতি করছেন। কারণ আপনি যদি পজিশন ছেড়ে একটুও নড়াচড়া না করেন, তবে প্রতিপক্ষের দুজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারও আপনার সাথে ওখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। এর ফলে একজন আপনাকে কড়া নজরে (ম্যান মার্কিং) রাখবে এবং অন্যজন একদম ফ্রি থাকবে। তখন সতীর্থদের পক্ষে আপনাকে বল দেওয়ার মতো কোনো ফাঁকা পথ বা সুযোগ তৈরি হয় না, কারণ আপনি নিজেই সেই পথ বন্ধ করে রাখছেন।"
পরিসংখ্যান ও মাঠের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ফোরলানের এই পর্যবেক্ষণ একেবারে অমূলক নয়। চলতি বিশ্বকাপে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি ছাড়া গ্রুপ পর্বের বাকি দুই ম্যাচেই নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন ৪১ বছর বয়সী এই তারকা। অনেক সময়ই তাকে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের ওপরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এই অচলাবস্থার সমাধান হিসেবে ফোরলান পরামর্শ দিয়েছেন, "সে যদি মাঠের দুই দিকের উইং ধরে কিছুটা সরে যায়, তাহলে দলের অন্য ফুটবলাররা ভেতরে ঢোকার ফাঁকা জায়গা পাবে। এমনকি সে নিজেও প্লে-মেকিং করে সতীর্থদের বল জোগান দিতে পারবে। ঠিক এই জায়গাতেই পর্তুগাল মার খেয়ে যাচ্ছে, কারণ তারা অল-আউট আক্রমণাত্মক হতে পারছে না। সব আক্রমণ একপাশে গিয়ে আটকে যাচ্ছে। আমি বলব না এটি কোনো বিশাল বড় সমস্যা, তবে তাকে অবশ্যই বোঝাতে হবে—মাঠে একটু নড়াচড়া করো, তাতে তুমিও দলের জন্য দারুণ কিছু করতে পারবে।" আগামী ৩ জুলাই নকআউট পর্বের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে রোনালদো নিজের এই পুরোনো কৌশল বদলে কী করতে পারেন, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।