ক্রীড়া ডেস্ক
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহাতারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনা মাঠের ভেতরের জাদুকরী পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মাঠের বাইরের ঠোঁটকাটা স্বভাব ও দূরদর্শী মন্তব্যের জন্যও সমাদৃত ছিলেন। উত্তর আমেরিকায় (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ-এর বাস্তবতার সঙ্গে ম্যারাডোনার ৮ বছর পুরোনো (২০১৮ সালের) একটি বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার হুবহু মিলে যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
স্পোর্টস মডেলের বাণিজ্যিকীকরণ এবং উত্তর আমেরিকার ফুটবল সংস্কৃতি নিয়ে করা প্রয়াত এই কিংবদন্তির সেই ভবিষ্যদ্বাণী কীভাবে বাস্তব রূপ নিলো, তা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ এবং বিজ্ঞাপনের বাণিজ্যিক ফাঁদ
২০১৮ সালে ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে যখন উত্তর আমেরিকার তিন দেশের নাম ঘোষণা করা হয়, তখন ম্যারাডোনা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, আমেরিকানরা ফুটবলের ঐতিহ্য নষ্ট করে কেবল বিজ্ঞাপনের স্বার্থে খেলাটিকে বদলে দেবে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের আগে যুক্তরাষ্ট্রের করা একটি প্রস্তাবের উদাহরণ টেনে ম্যারাডোনা বলেছিলেন:
"বিজ্ঞাপন ঢোকানোর সুবিধার্থে আমেরিকানরা খেলাটিকে দুই অর্ধেকের বদলে ২৫ মিনিট করে চার কোয়ার্টারে ভাগ করতে চেয়েছিল। মিলিয়ে নিও, শেষ পর্যন্ত এটাই দেখতে পাবে।"
বর্তমান বাস্তবতা: ২০২৬ বিশ্বকাপে যদিও নিয়ম অনুযায়ী খেলা ৪৫ মিনিটের দুই হাফেই হচ্ছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেন্যুগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত গরম ও তাপমাত্রার কারণে ফিফার প্রটোকল অনুযায়ী রেফারিরা ম্যাচে অফিসিয়াল ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ (Hydration Break) বা পানি পানের বিরতি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য দেওয়া এই বিরতিকেই সম্প্রচারকারী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কাজে লাগাচ্ছে এবং সেই সময়ে দেদারসে বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। ফলে ম্যারাডোনার আশঙ্কাই সত্য হলো—খেলা চার ভাগে ভাগ না হলেও ঠিকই মাঠের বিরতি ব্যবহার করে বাণিজ্যিক ফায়দা নেওয়া হচ্ছে।
২. কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল সংস্কৃতি নিয়ে কটাক্ষ
যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় ফুটবলের ঐতিহ্য বা খাঁটি আবেগের অভাব নিয়ে সবসময়ই সোচ্চার ছিলেন ১৯৮৬-র বিশ্বকাপজয়ী এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। উত্তর আমেরিকান স্পোর্টস সংস্কৃতির সমালোচনা করে সে সময় তিনি বলেছিলেন:
"ওদের ফুটবলের প্রতি কোনো খাঁটি আবেগ নেই। কানাডিয়ানরা বড়জোর ভালো স্কিইয়ার (Skiers) হতে পারে, ফুটবল ওদের জন্য নয়।"
চলমান বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ফুটবল দল মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, মাঠের বাইরের গ্যালারি বা আবহ দেখে ফুটবল রোমান্টিকরা এখনও ম্যারাডোনার সেই "খাঁটি আবেগের অভাব" সংক্রান্ত মন্তব্যটির প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাচ্ছেন।
৩. মেক্সিকোকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য
ঐতিহাসিকভাবে মেক্সিকো একটি ফুটবল পাগল দেশ হলেও তাদেরকে যৌথ আয়োজক করার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন ম্যারাডোনা। মেক্সিকোর বড় দলগুলোর বিপক্ষে ভেঙে পড়ার মানসিকতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছিলেন:
"মেক্সিকো এই আসর পাওয়ার যোগ্যই না। মেক্সিকানরা যখনই জার্মানি কিংবা ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়... ব্যস, ওখানেই তারা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়।"
চলমান বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে দলগুলোর ভাগ্য নির্ধারণের পাশাপাশি ম্যারাডোনার এই ঐতিহাসিক মন্তব্যটি ভক্তদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, নকআউট বা বড় মঞ্চে এখনো মেক্সিকোকে সেই পুরোনো জুজুর ভয় তাড়া করে বেড়ায় কি না।
দিয়েগো ম্যারাডোনা ২০২০ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেও, ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার ফুটবল মঞ্চে যেন তাঁর প্রতিটি কথাই অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হচ্ছে। ফুটবল ঈশ্বরের এই দূরদর্শিতা প্রমাণ করে, মাঠের ৯০ মিনিটের সমীকরণের বাইরেও ফুটবলের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ কতটা নিখুঁতভাবে পড়তে পারতেন তিনি।
আকাশজমিন / আরআর