বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে লিওনেল মেসি নামটা যেন রেকর্ডের সমার্থক শব্দ। প্রতি ম্যাচেই তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন, লিখছেন নতুন নতুন মহাকাব্য। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল আলবিসেলেস্তেরা। গোটা ফুটবল বিশ্বকে বুঁদ করে রাখা সেই ৩-২ ব্যবধানের শ্বাসরুদ্ধকর ও রুদ্ধশ্বাস জয়ের রাতে আর্জেন্টিনা যেমন নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে, ঠিক তেমনি মাঠের ভেতরের জাদুকরী পারফরম্যান্সে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন এলএমটেন। এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার পক্ষে প্রথম গোলটি আসে মেসির পা থেকেই। আর এই একটি গোলের সুবাদেই তিনি ভেঙেছেন ও গড়েছেন একের পর এক অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের মালিক আগে থেকেই ছিলেন আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই মহাতারকা। তবে কেপ ভার্দের জাল কাঁপিয়ে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোল সংখ্যাকে তিনি নিয়ে গেছেন ২০-এর অনন্য উচ্চতায়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে নকআউট পর্বের আগে বা পরে মিলিয়ে মোট ২০টি গোল করার অবিস্মরণীয় কীর্তি এখন এই আর্জেন্টাইন অধিনায়কের ঝুলিতে। রেকর্ড বুক ওলটপালট করা এই জাদুকরের কীর্তি এখানেই শেষ নয়। ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে তিনিই প্রথম এবং একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ফুটবলার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে রেকর্ড ৩০টি ম্যাচ খেলার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। এর আগে কোনো ফুটবলারই বিশ্বকাপের মঞ্চে এতগুলো ম্যাচ খেলার সৌভাগ্য বা ধারাবাহিকতা অর্জন করতে পারেননি। একই সাথে এই ম্যাচে গোল করার মাধ্যমে তিনি ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের মঞ্চে রেকর্ড ১৮টি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠানোর অবিশ্বাস্য গৌরব অর্জন করেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে নাচিয়ে গোল করার এই অতিমানবীয় ধারাবাহিকতা কেবল মেসির পক্ষেই দেখানো সম্ভব, তা তিনি আবারও প্রমাণ করলেন।
ম্যাচটিতে গোল করার পাশাপাশি দলের জয়ে অবদান রেখে নকআউটের পরিসংখ্যানে কিংবদন্তি পেলে এবং কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে গেছেন মেসি। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২টি গোলে সরাসরি অবদান রাখার রেকর্ড এখন তার। যেখানে তিনি নিজে করেছেন ৬টি গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৬টি গোল। এই তালিকায় ১১টি করে গোল ও অ্যাসিস্ট নিয়ে যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন ব্রাজিলের কালো মানিক পেলে এবং ফ্রান্সের বর্তমান তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটি মেসিকে নিয়ে গেছে সবার শীর্ষে। এছাড়া ফুটবল বিশ্বকাপের আসরে টানা ৮টি ম্যাচে গোল করার এক অবিশ্বাস্য ও প্রথম নজিরবিহীন নজির স্থাপন করেছেন এলএমটেন। বিশ্বের কোনো স্ট্রাইকার বা ফরোয়ার্ড আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের টানা আট ম্যাচে জালের দেখা পাননি, যা মেসি করে দেখালেন।
সবশেষে, বিশ্বকাপের একাধিক আসরে নূন্যতম ৭টি বা তার বেশি গোল করার এক অনন্য ইতিহাস গড়লেন ফুটবলের এই খুদে জাদুকর। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার পথে তিনি করেছিলেন ৭টি গোল। আর চলমান এই বিশ্বকাপ আসরেও ইতিমধ্যে তিনি করে ফেলেছেন ৭টি গোল। বিশ্বকাপের ভিন্ন দুটি আসরে ৭ বা তার বেশি গোল করার এই কীর্তি ফুটবল বিশ্বে আর কোনো খেলোয়াড়ের নেই। কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই মহানাটকীয় জয়টি তাই কেবল দলের শেষ ষোলো নিশ্চিত করার ম্যাচ হিসেবেই স্মরণীয় থাকবে না, বরং এটি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লিওনেল মেসির রেকর্ডময় এক শ্রেষ্ঠত্বের রাত হিসেবে অনন্তকাল অমর হয়ে থাকবে।
আকাশজমিন / আরআর