বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে ইতিহাস গড়ল মিশর। টুর্নামেন্টের রাউন্ড অব থার্টি টু বা বত্রিশের পর্বের এক শ্বাসরুদ্ধকর ও অতি নাটকীয় ম্যাচে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম নকআউট জয় তুলে নিয়েছে ফারাওরা। তবে এই ঐতিহাসিক এবং স্মরণীয় জয়টি কেবল নিজেদের আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি এই ঐতিহাসিক গৌরবময় জয়টি ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার ঘোষণা দেন। মিশরের এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পর আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর মতোই যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষও গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তায় নেমে আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেন এবং এই ঐতিহাসিক জয়ের উৎসবে শামিল হন।
গত শুক্রবার ডালাসের বিশ্বমানের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় অত্যন্ত সতর্কতাপূর্ণ এবং রোমাঞ্চে ঠাসা এই ফুটবল ম্যাচটি। খেলার শুরু থেকেই দুই দলই অত্যন্ত রক্ষণাত্মক ও হিসেবি ফুটবল খেলতে থাকে। ম্যাচের একদম শুরুর দিকেই, অর্থাৎ ১৩তম মিনিটে দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে ইমাম আশুরের চমৎকার হেডের সাহায্যে গোল করে মিশরকে এগিয়ে নেন এবং পুরো গ্যালারিতে আনন্দের জোয়ার ভাসান। তবে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের ১০ মিনিটে মোহামেদ হানির একটি দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোলের কারণে ম্যাচে সমতায় ফেরে অস্ট্রেলিয়া। এরপর নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং পরবর্তীতে অতিরিক্ত সময়েও ১-১ ব্যবধানে সমতা বজায় থাকায় ম্যাচটি গড়ায় ভাগ্যনির্ধারণী টাইব্রেকারে। সেখানে স্নায়ুচাপ ধরে রেখে ৪-২ ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়াকে পরাস্ত করে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করে আফ্রিকান পরাশক্তিরা।
টাইব্রেকারে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে হ্যারি সাউতার এবং লুকাস হেরিংটন পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি মিশরের হাতে চলে আসে। এরপর মিশরের হোসাম আবদেলমাগুইদ ১২ গজ দূর থেকে নিখুঁত ও সফল স্পট-কিকে বল জালে জড়ালে নিশ্চিত হয় মিশরের ঐতিহাসিক জয়। এই অবিশ্বাস্য জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ ষোলোর মঞ্চে ল্যাটিন আমেরিকার দল আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করল মোহামেদ সালাহর দল। ম্যাচ শেষে মাঠের ভেতরে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। জয় নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই মিশরের পুরো ফুটবল দল এবং কোচিং স্টাফ মাঠের সবুজ ঘাসে মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদায় লুটিয়ে পড়েন। এরপর প্রধান কোচ হোসাম হাসান নিজের হাতে মিশর এবং ফিলিস্তিনের জাতীয় পতাকা উঁচিয়ে ধরে মাঠের চারপাশে চক্কর দেন, যা উপস্থিত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
পরবর্তীতে ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান অত্যন্ত আবেগপ্রবণ কণ্ঠে বলেন, মহান আল্লাহ ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষদের অতি দ্রুত চূড়ান্ত বিজয় দান করুন এবং সেখানকার সকল বীর শহীদদের প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করুন। তিনি ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং দলের পক্ষ থেকে আমাদের এই ঐতিহাসিক ফুটবল বিজয়টি মিশরের আপামর জনসাধারণের পাশাপাশি ফিলিস্তিনের সেই দয়ালু, নির্যাতিত ও অত্যন্ত সম্মানিত মানুষদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটিই ছিল মিশরের প্রথম কোনো ম্যাচ এবং প্রথম ম্যাচেই এমন অবিস্মরণীয় জয় ফুটবল ইতিহাসে দলটিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল, যা মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি রাজনৈতিক এবং মানবিক দিক থেকেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।