ক্রীড়া
প্রতিবেদক
বলকান অঞ্চলের রুক্ষ পাহাড়ি উপত্যকা থেকে উঠে আসা এক অদম্য ক্রোয়াট যোদ্ধা লুকা মডরিচ। যিনি তরবারি নয়, নিজের ফুটবল শৈলী আর ইস্পাতকঠিন জেদ দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস নতুন করে লিখেছেন। ইতিহাস যাঁদের চিরকাল ‘ট্র্যাজিক হিরো’ বা বিষণ্ন বিজয়ী হিসেবে মনে রাখে, মডরিচ যেন সেই কাতারেরই এক অগ্রগণ্য মহাতারকা। পাঁচটি বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার সোনালি প্রজন্মকে নেতৃত্ব দিয়ে একবার ফাইনাল আর দুবার সেমিফাইনালে তুলেছেন, অথচ শেষ পর্যন্ত সেই কাঙ্ক্ষিত সোনালি ট্রফি স্পর্শ করার সৌভাগ্য তাঁর হলো না। পর্তুগালের বিপক্ষে ২-১ গোলের হার দিয়ে এক বুক অভিমান আর চোখের জলে শেষ হলো এই কিংবদন্তির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর মডরিচের শূন্য দৃষ্টি ও ক্লান্ত হাসি বলে দিচ্ছিল, বিশ্ব ফুটবলের এক জাদুকরি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর প্রযুক্তির নাটকীয়তায় শেষ মুহূর্তে গোল বাতিল হওয়ার বিষাদ এবং দীর্ঘদিনের বন্ধু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বুকে মাথা রেখে বিদায়ের সেই আলিঙ্গন—ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল দাগ কেটে থাকবে। ২০০৬ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে মাত্র ২০ বছর বয়সে উশকোখুশকো চুলের যে রোগাপটকা তরুণ আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রেখেছিলেন, বলকানের যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থী শিবির থেকে আসা সেই ছেলেই হয়ে উঠেছিলেন ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের মূল কাণ্ডারি। ডাভর সুকারের মতো স্ট্রাইকারের পর ইভান রাকিটিচ, মারিও মাঞ্জুকিচ, ইভান পেরিসিচদের এক সুতোয় বেঁধে কখনও হাল না ছাড়ার মন্ত্র শিখিয়েছিলেন এই মাঝমাঠের জেনারেল।
মডরিচের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গৌরবময় ও একই সঙ্গে বুকভাঙা অধ্যায় ছিল ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ। একের পর এক অতিরিক্ত সময় আর টাইব্রেকারের অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে দলকে ফাইনালে তুললেও ফ্রান্সের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাঁর। রানার্সআপ হলেও আসরের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর হাতে উঠেছিল ‘গোল্ডেন বল’। এর চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপেও ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিকে স্তব্ধ করে দিয়ে দলকে এনে দেন ব্রোঞ্জপদক। ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে সর্বকালের সর্বোচ্চ ২০০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অনন্য রেকর্ডের পাশাপাশি ২৭টি গোল ও অসংখ্য অ্যাসিস্ট রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ২০১৮ সালে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এক দশকের রাজত্ব ভেঙে তাঁর ব্যালন ডি’অর জয়ই প্রমাণ করে সমসাময়িক ফুটবলে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব।
তবে এই মহাকাব্যের শেষ পাতাটি বড্ড বেশি অম্লমধুর ও বিতর্কিত হয়ে রইল। ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে এসে মডরিচ প্রযুক্তির নির্মমতার বিরুদ্ধে নিজের ক্ষোভ উগরে দেন। ১০৩ মিনিটের গোলটি ভিএআরের চুলচেরা সিদ্ধান্তে বাতিল হওয়া প্রসঙ্গে ক্ষুব্ধ অধিনায়ক বলেন, ড্রেসিংরুমে বারবার ফুটেজ দেখেও বল স্পর্শ করার কোনো প্রমাণ মেলেনি। বড় ম্যাচে এমন নিষ্ঠুর প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত ফুটবলের সৌন্দর্য নষ্ট করে। প্রথমার্ধের অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশলের দায় মেনে নিলেও দ্বিতীয়ার্থের লড়াই নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন তিনি। নিজের আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে কেবল এক চিলতে মলিন হাসি উপহার দিয়ে বিদায় নেন এই বিষণ্ন মহানায়ক।
আকাশজমিন/ আরআর