গ্রেট ব্রিটেনের ঐতিহাসিক ফুটবল ঐতিহ্য বনাম ল্যাটিন আমেরিকার মাঠের লড়াই ছাড়িয়ে এবারের ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর নকআউট পর্বের শুরুতেই দেখা গেল এক চরম নাটকীয়তা। রাউন্ড অব থার্টি টু তথা শেষ বত্রিশের এক শ্বাসরুদ্ধকর ও স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে পেনাল্টি শুটআউটে পরাজিত করে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার পরাশক্তি মিসর। মাঠের নির্ধারিত ৯০ মিনিটের লড়াই ১-১ গোলে সমতায় শেষ হওয়ার পর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। সেখানেও দুই দলের রক্ষণভাগের অনবদ্য নৈপুণ্যে কোনো গোল না হওয়ায় অবশেষে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য লড়াই গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে। সেখানে চরম উত্তেজনার মাঝে নিজেদের স্নায়ুচাপ ধরে রেখে ৪-২ ব্যবধানের এক অবিশ্বাস্য ও ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়েছে ফারাওরা, যার ফলে বিদায়ের করুণ কান্না সঙ্গী করে মাঠ ছাড়তে হয়েছে সকারুজদের।
যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ গালিচায় ম্যাচের শুরুর বাঁশি বাজার পর থেকেই দুই দলের আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে খেলাটি দারুণ জমে ওঠে। ম্যাচের মাত্র ১৩তম মিনিটে এক নিখুঁত আক্রমণ থেকে এমাম আশৌরের চমৎকার ও দুর্দান্ত গোলে প্রথমার্ধেই লিড বা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় মিসর। প্রথমার্ধের পুরোটা সময় মাঠের আধিপত্য ও এই লিড ধরে রাখতে সফল হলেও, দ্বিতীয়োর্ধের শুরুতেই এক দুর্ভাগ্যজনক গোল হজম করতে হয় সালাহদের। ম্যাচের ৫৫তম মিনিটে রক্ষণভাগ সামলাতে গিয়ে মিসরের ডিফেন্ডার মোহাম্মদ হানির পা থেকে একটি আত্মঘাতী গোল হয়ে যায়, যার ফলে ম্যাচে ১-১ গোলে সমতায় ফেরে অস্ট্রেলিয়া। এরপর নির্ধারিত সময়ের বাকিটা সময় এবং অতিরিক্ত সময়েও দুই দল বেশ কিছু নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করলেও তা জালের দেখা পায়নি।
খেলার ভাগ্য যখন টাইব্রেকারে গড়ায়, তখন মাঠের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়াকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেয় উত্তর আফ্রিকার দলটি। পেনাল্টি শুটআউটে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে প্রথম শট নিতে আসা হ্যারি সুটার মিসরের গোলরক্ষকের দক্ষতায় লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হন। এরপরের দুই শটে জ্যাকসন আরভাইন এবং আওয়ার মাবিল সফলভাবে গোল করলেও, চতুর্থ শট নিতে এসে মারাত্মক ভুল করে বসেন লুকাস হেরিংটন। তাঁর নেওয়া শটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সাথে সাথেই মূলত অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ঘণ্টা বেজে ওঠে। অন্যদিকে, তীব্র চাপের মুখেও মিসরের পেনাল্টি টেকাররা ছিলেন শতভাগ নিখুঁত ও অবিচল। মিসরের হয়ে মাহমুদ সাবের, রামি রাবিয়া, বিশ্বফুটবলের মহাতারকা মোহামেদ সালাহ এবং হোসাম আবদেলমাগুইদ টানা চারটি শটেই অজি গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান এবং দলের মহাকাব্যিক জয় নিশ্চিত করেন।
পুরো ম্যাচের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বল দখলের লড়াইয়ে মাঠের ভেতরে স্পষ্ট আধিপত্য ছিল মোহামেদ সালাহদের। পুরো ম্যাচের ৫৮ শতাংশ সময় বল নিজেদের পায়ে রেখে খেলা নিয়ন্ত্রণ করেছে মিসর। তবে আক্রমণে অজিরাও খুব একটা পিছিয়ে ছিল না; পুরো ম্যাচে মিসরের ১৪টি শটের বিপরীতে অস্ট্রেলিয়া আক্রমণভাগে হানা দিয়ে ১৫টি শট নিয়েছে। নিখুঁত পাসিংয়ের ক্ষেত্রেও আফ্রিকান দলটির দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রায় ৮৯ শতাংশ সফলতার হার বজায় রেখে পুরো ম্যাচে তারা ৬৯৬টি নিখুঁত পাস খেলেছে। এর বিপরীতে ক্যাঙ্গারুর দেশ অস্ট্রেলিয়ার ফুটবলাররা নিজেদের মধ্যে পাস আদান-প্রদান করতে পেরেছেন মোটে ৫১৮টি। এই জয়ের মধ্য দিয়ে নকআউট পর্বের পরবর্তী রাউন্ড তথা শেষ ষোলোর মঞ্চে ল্যাটিন আমেরিকার পরাশক্তি আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার গৌরব অর্জন করল মিসর।