গত দুই দশক ধরে ফুটবল বিশ্বকাপে ইউরোপীয় দলগুলোর কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার যে ‘ইউরোপীয় ভূত’ ব্রাজিলকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, এবার সেই অভিশপ্ত বৃত্ত ও নরওয়ে জুজু ভেঙে নতুন ইতিহাস লিখতে শতভাগ প্রস্তুত সেলেসাওরা। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আগামীকাল যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে নরওয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বমঞ্চে নরওয়ের বিপক্ষে চারবার মুখোমুখি হয়ে একবারও জয়ের মুখ দেখেনি লাতিন আমেরিকার এই পরাশক্তি। বিশেষ করে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের ২-১ গোলের পরাজয়টি এখনো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন। তবে অতীতের সেই কালো ইতিহাসকে পেছনে ফেলে এবার সম্পূর্ণ নতুন এক গল্প লিখতে মরিয়া ব্রাজিলিয়ান শিবির, যার আভাস মিলেছে দলের তারকা ফরোয়ার্ড ম্যাথিয়াস কুনিয়ার আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে।
নিউ জার্সিতে আয়োজিত এক জমজমাট সংবাদ সম্মেলনে অতীতের এই ব্যর্থতার জুজু কাটানো প্রসঙ্গে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ৯ নম্বর জার্সির দাবিদার ম্যাথিয়াস কুনিয়া বেশ দৃঢ়তার সাথে বলেন, “অতীতের ভূত যদি তাড়াতে হয়, তবে মাঠে আমাদের নিজেদের কাজটা নিখুঁতভাবে করতে হবে। আমরা এবার মাঠে নামছি সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায় তৈরি করতে।” ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রতিবারই ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়ার মতো ইউরোপীয় দলগুলোর কাছে হেরেই ব্রাজিলের বহুল প্রতীক্ষিত ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে। তবে শেষ ৩২-এর ম্যাচে জাপানকে বিদায় করার পর কার্লো আনচেলত্তির অধীনে থাকা ব্রাজিলের আক্রমণের ধার এবং রক্ষণভাগের বর্ম দানিলো ও দগলাস সান্তোসদের ওপর ভরসা রাখছেন কোটি সমর্থক। ডিফেন্ডার দগলাস সান্তোস স্পষ্ট জানিয়েছেন, নরওয়েকে আজ পর্যন্ত হারাতে না পারার যে অপবাদ রয়েছে, সেটাই এবার ঘুচিয়ে ফেলার জন্য দলের বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
এই ম্যাচের রণকৌশল নিয়ে বলতে গেলে, এটিকে মূলত নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড বনাম ব্রাজিলের বিশ্বসেরা রক্ষণভাগের এক চরম দ্বৈরথ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার হালান্ডকে আকাশপথে রুখতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও বুন্দেসলিগার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবেন গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস ও কুনিয়ারা। তবে ম্যাচের আগে ব্রাজিল শিবিরে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে তারকা মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতার চোট। পাকেতা ছিটকে যাওয়ায় তাঁর পরিবর্তে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে মাঝমাঠে পরখ করে দেখছেন ইতালীয় মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তি। ক্লাব ফুটবলে ব্যক্তিগতভাবে হালান্ডের বিপক্ষে আটবার মুখোমুখি হয়ে আনচেলত্তির রেকর্ড সমান-সমান (২ জয়, ২ হার, ৪ ড্র)। অন্যদিকে, ২৮ বছর আগে ব্রাজিলের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করা নরওয়ের সাবেক তারকা কেইটেল রেকডাল দাবি করেছেন, অতীত ইতিহাসের কারণে ব্রাজিলই এই ম্যাচে সবচেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক চাপে থাকবে।
অবশ্য নরওয়ের বর্তমান কোচ স্তালে সলবাক্কেনের মূল দুশ্চিন্তা হলো নিজের ডিফেন্ডারদের বক্সের আশেপাশে বল হারানোর বাজে প্রবণতা। কারণ, আনচেলত্তির এই নতুন ব্রাজিল প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে গোল করায় এই বিশ্বকাপে সবার ওপরে রয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের ৯টি গোলের ৪টিই এসেছে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ভুলের সুযোগ নিয়ে। তদুপরি, নরওয়ে শিবিরে ভয় ধরাতে ম্যাচের শেষভাগে সুপার-সাব হিসেবে মাঠে নামতে পারেন মহাতারকা নেইমার। সব মিলিয়ে, দুই দশকের ইউরোপীয় ভূত ও নরওয়ে জুজু তাড়াতে সেলেসাওরা এবার কোনো অস্ত্রই বাকি রাখবে না।