ক্রীড়া
প্রতিবেদক
বিশ্বকাপ জয়ের আজন্ম লালিত স্বপ্নটা আবারও অধরাই থেকে গেল ফুটবলের রাজপুত্রদের। নকআউট পর্বের প্রথম ধাপেই নরওয়ের কাছে ২–১ গোলের স্তব্ধ করে দেওয়া হারে বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। এই নির্মম পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জয়ের খরা যেমন আরও দীর্ঘ হলো, তেমনি সেলেসাও ফুটবল ইতিহাসে যুক্ত হলো এক কালো অধ্যায়। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর এই প্রথম বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মঞ্চ থেকেই ব্যাগ গোছাতে হলো ব্রাজিলকে। এর আগে সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে ১–০ গোলে হেরে এই রাউন্ড থেকে বিদায় নিয়েছিল তারা। মাঝের দীর্ঘ ৩৬টি বছর আর টানা নয়টি বিশ্বকাপে অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা দলটির এমন পতন কেউ ভাবতেও পারেনি।
নিউ ইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে সোমবারের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে শুরু থেকেই এক বুক আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলতে নামে নরওয়ে। ম্যাচের মাত্র ৩ মিনিটের মাথায় প্যাট্রিক বার্গ বল ব্রাজিলের জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে রেফারি তা বাতিল করে দেন। তবে তাতে দমে না গিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হোল্ডে রেখে ব্রাজিলের রক্ষণভাগে অনবরত কাঁপন ধরাতে থাকেন মার্টিন ওডেগার্ড, আলেক্সান্ডার সরলথ ও আর্লিং হলান্ডরা। ম্যাচের প্রথম দিকের সেই চেনা লাতিন ছন্দ হারিয়ে ব্রাজিল যখন ধুঁকছিল, ঠিক তখনই আসে এক সুবর্ণ সুযোগ। ১৩তম মিনিটে ম্যাথেউস কুনিয়াকে ডি-বক্সের ভেতরে ফাউল করা হলে ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। কিন্তু কোটি ভক্তকে হতাশায় ডুবিয়ে ব্রুনো গিমারায়েসের নেওয়া স্পটকিক ডানদিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন নরওয়েজিয়ান প্রাচীর ওরইয়ান নিল্যান্ড। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৮৬ সালের পর বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কোনো ফুটবলারের প্রথম পেনাল্টি মিসের রেকর্ড এটি।
প্রথমার্ধের বাকি সময়ে মার্তিনেল্লি ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুটি নিশ্চিত গোলের প্রচেষ্টা রুখে দেন ঈর্ষণীয় ফর্মে থাকা গোলকিপার ওরইয়ান নিল্যান্ড। অন্যদিকে যোগ করা সময়ে মার্টিন ওডেগার্ডের এক বুলেট গতির শট ঠেকিয়ে ব্রাজিলের ত্রাতা হন অ্যালিসন বেকার। গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার বাড়ায় সেলেসাওরা। ৬০ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেই নরওয়ের গোলরক্ষককে একা পেয়েও এক সহজ সুযোগ নষ্ট করেন তরুণ স্ট্রাইকার এন্দ্রিক। এরপর রায়ানের দূরপাল্লার এক বাঁকানো শট কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন নিল্যান্ড। ম্যাচের ৬৮ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির বদলে ইনজুরি কাটিয়ে মাঠে নামানো হয় প্রাণভোমরা নেইমারকে। কিন্তু সব আলো কেড়ে নেন নরওয়ের বদলি খেলোয়াড় আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ। ৭৯ মিনিটে তাঁর এক নিখুঁত ক্রস থেকে বাতাসে ভেসে দুর্দান্ত হেডে গোল করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন আর্লিং হলান্ড।
গোল খেয়ে ব্রাজিল যখন সমতায় ফিরতে মরিয়া, ঠিক তখনই কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ৮৯ মিনিটে আবারও সেই আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের পাস থেকে ডি-বক্সের ঠিক কোণ থেকে এক নিখুঁত ও জোরালো শটে নিজের ও দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন হলান্ড। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল ম্যানচেস্টার সিটি স্ট্রাইকারের সপ্তম গোল, যা তাঁকে গোল্ডেন বুটের রেসে কিলিয়ান এমবাপ্পেদের পাশে এক নম্বর আসনে বসিয়ে দেয়। ম্যাচের একদম অন্তিম মুহূর্তে ১০০তম মিনিটে ক্যাসেমিরোকে ফাউল করার সুবাদে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। সেখান থেকে নেইমার গোল করে ব্যবধান ২–১ করলেও তা কেবল সান্ত্বনার গল্পই লিখেছে। শেষ বাঁশি বাজতেই মাত্র ৫৬ লাখ জনসংখ্যার দেশ নরওয়ে মেতে ওঠে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার রূপকথার উল্লাসে। আর মাঠের মাঝে দুইহাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমার। ২০০২ সালের পর নকআউটে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়ে ২০০৬-এ ফ্রান্স, ২০১০-এ নেদারল্যান্ডস, ২০১৪-তে জার্মানি, ২০১৮-তে বেলজিয়াম, ২০২২-এ ক্রোয়েশিয়া এবং এবার ২০২৬-এ নরওয়ের কাছে হেরে বিদায়ের সেই 'ইউরোপীয় অভিশাপ' থেকে আর মুক্ত হওয়া হলো না ব্রাজিলের।
আকাশজমিন/ আরআর