ক্রীড়া
প্রতিবেদক
হলুদ-সবুজ জার্সিতে আর কখনো মাঠ মাতাতে দেখা যাবে না সাম্বা ফুটবলের আধুনিক জাদুকর নেইমার জুনিয়রকে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের আকস্মিক ও বেদনাবিধুর বিদায়ের পরপরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিজের অবসরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন সেলেসাও ইতিহাসের এই সর্বোচ্চ গোলদাতা। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর হাইভোল্টেজ ম্যাচে সোমবার (৬ জুলাই) নরওয়ের কাছে ২–১ গোলে হেরে বিশ্বমঞ্চ থেকে ছিটকে যায় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। নিউ জার্সির মাঠে সেই বুকভাঙা ম্যাচের যোগ করা সময়ের ১০ম মিনিটে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের হয়ে একমাত্র সান্ত্বনার গোলটি করেছিলেন নেইমার। কে জানত, কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে করা সেই গোলটিই শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের গৌরবময় জার্সিতে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ গোল হয়ে থাকবে! ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠের মাঝে হাঁটু গেড়ে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এর কিছুক্ষণ পরেই সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে অশ্রুসিক্ত চোখে ও আবেগঘন কণ্ঠে নিজের বিদায়ের কথা জানান ৩৪ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড। অত্যন্ত ভারী গলায় তিনি বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি, নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এখানেই আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর এখানেই শেষ হলো। এখন সব শেষ।’
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিল ফুটবলকে একা কাঁধে টেনে নিয়ে যাওয়া নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান যেন এক রূপকথা। ব্রাজিলের হয়ে ১৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে নেমে তিনি করেছেন রেকর্ড ৮০টি গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৫৯টি গোল। পেলের মতো মহানায়ককে টপকে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনটি এখন তাঁরই দখলে। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় দলগত সাফল্য ছিল ২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ জয়, যেখানে ফুটবল বিশ্ব দেখেছিল তাঁর পায়ের অবিশ্বাস্য জাদু। এ ছাড়া ২০১৬ সালে নিজেদের মাটিতে রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলকে ফুটবল ইতিহাসের প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক জেতাতেও বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই মহাতারকা। তবে শত চেষ্টা সত্ত্বেও ফুটবল বিশ্বকাপের অধরা ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরার পরম স্বপ্নটা শেষ পর্যন্ত অপূর্ণই থেকে গেল লাতিন ফুটবলের এই রাজপুত্রের।
আসন্ন এই বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখার আগেই নেইমারের ফিটনেস ও চোট নিয়ে ছিল চরম সংশয় ও শঙ্কা। দীর্ঘদিন ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করা এই তারকাকে পুরোপুরি ফিট না থাকা সত্ত্বেও দলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাঁর ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডে রেখেছিলেন কেবল তাঁর অবিশ্বাস্য ফুটবলীয় মস্তিস্ক ও অভিজ্ঞতার কারণে। তবে চোটের অভিশাপ এই টুর্নামেন্টেও তাঁর পিছু ছাড়েনি, যার ফলে পুরো বিশ্বকাপে তাঁকে নিজের চেনা ছন্দে দেখা যায়নি। গ্রুপ পর্বের কোনো ম্যাচেই তিনি পূর্ণ এক অর্ধেও মাঠে থাকতে পারেননি। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ১৬-র এই বাঁচা-মরার লড়াইয়েও শুরুর একাদশে ছিলেন না নেইমার, পরে ম্যাচের গতি পরিবর্তন করতে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে ডাগআউট থেকে মাঠে নামেন তিনি।
সেই ম্যাচে পেনাল্টি থেকে নিখুঁত এক শটে গোল করে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোলসংখ্যা ৯–এ নিয়ে যান নেইমার। একই সঙ্গে ফুটবল সম্রাট পেলের পর দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য ও ঐতিহাসিক কীর্তি গড়েন তিনি। কিন্তু ব্যক্তিগত এই চোখধাঁধানো অর্জনও শেষ পর্যন্ত দলের বিদায়ের নির্মম ট্র্যাজেডি রুখতে পারেনি। নরওয়ের বিপক্ষে এই ২–১ গোলের পরাজয়ের মাধ্যমে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে ইউরোপীয় জুজু বা অভিশাপ আরও দীর্ঘায়িত হলো। ২০০২ সালে সর্বশেষ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইউরোপীয় কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আর জয়ের মুখ দেখেনি সেলেসাওরা। এবার সেই অভিশপ্ত তালিকায় যুক্ত হলো নরওয়ের নাম। শেষ বাঁশি বাজার পর নেইমারের সেই অশ্রুভেজা চোখ কোটি ভক্তের হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দেয়, যার পরপরই তিনি জানিয়ে দেন ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে তাঁর সোনালী অধ্যায়ের চিরসমাপ্তি ঘটেছে। বিদায়লগ্নে বিশ্বকাপ ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেলেও তাঁর জাদুকরী গোল, নিখুঁত অ্যাসিস্ট এবং ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে রেখে যাওয়া অনন্য কীর্তির জন্য ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেলেসাও তারকা হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
আকাশজমিন/ আরআর