বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে তিনি নিজেকে মেলে ধরতে পারবেন কি না, এই নিয়ে ফুটবল মহলে প্রশ্নের কমতি ছিল না। তবে সমালোচকদের সেই সব সংশয় আর প্রশ্নকে বুলেটের মতো গোলের বন্যায় উড়িয়ে দিয়েছেন নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। চলতি টুর্নামেন্টে মাত্র চার ম্যাচে ৭ গোল করার অবিশ্বাস্য এক কীর্তি গড়ে নরওয়েকে একাই টেনে তুলেছেন নকআউট পর্বে। একই সঙ্গে নিজের নামের পাশে যুক্ত করে নিয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের আরও কিছু বিস্ময়কর ও চোখধাঁধানো পরিসংখ্যান। ২৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার আগে থেকেই দারুণ সব কীর্তিতে মোড়ানো। মলদোভার বিপক্ষে এক ম্যাচে একাই ৫ গোল করা কিংবা জাতীয় দলের জার্সিতে পাঁচটি দৃষ্টিনন্দন হ্যাটট্রিক—সব মিলিয়ে নরওয়ের ড্রেসিংরুমে তিনি যে কতটা সংহারক রূপ ধারণ করতে পারেন, তা এতদিনে জেনে গেছে ফুটবল বিশ্ব।
বড় আসরে তাঁর কার্যকারিতা নিয়ে সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল বিদেশি গণমাধ্যম আইটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘হালান্ড বিশাল এক চরিত্র এবং বড় মাপের ব্যক্তিত্ব। অনেক সময় সমালোচকেরা বলতেন যে, সে বিশ্বমঞ্চে এখনো নিজেকে প্রমাণ করতে পারেনি। তবে এখন সেই কথার আর কোনো ভিত্তি রইল না।’ চলতি আসরের গ্রুপ পর্ব থেকেই চেনা ছন্দে রাজত্ব করছেন এই গোলমেশিন। ইরাক ও সেনেগালের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চূর্ণ করে জোড়া গোল উপহার দেন তিনি। এরপর ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে তাকে কৌশলগত কারণে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল, যেখানে নরওয়ে তাদের মূল একাদশে ১০টি পরিবর্তন এনে ৪-১ ব্যবধানে হেরেছিল। তবে টিম ম্যানেজমেন্টের সেই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত পরে নকআউট পর্বে দারুণ কাজে দেয়। সতেজ শরীরে মাঠে ফিরে শেষ ষোলোর ম্যাচে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল করেন হালান্ড। এরপর শক্তিশালী ব্রাজিলের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও করেন জাদুকরী জোড়া গোল, যা লাতিন পরাশক্তিদের টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেয়।
সব মিলিয়ে নরওয়ের জাতীয় দলের জার্সিতে হালান্ডের আন্তর্জাতিক গোল সংখ্যা এখন ৫৪ ম্যাচে ৬২টি। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ৭১ মিনিটে একটি করে আন্তর্জাতিক গোল করার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই ৬২টি আন্তর্জাতিক গোলের মধ্যে মাত্র ৬টি গোল এসেছে পেনাল্টি স্পট থেকে, যা তাঁর মাঠের স্বাভাবিক স্কিলকে প্রমাণ করে। দেশের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে এই নরওয়েজিয়ান তারকার ধারাবাহিকতা এক কথায় চোখ কপালে তোলার মতো। নরওয়ের হয়ে টানা ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে গোল করার অনন্য নজির গড়েছেন তিনি, যার মধ্যে এই নির্দিষ্ট সময়েই তাঁর পা থেকে এসেছে ২৭টি গোল। দেশের জার্সিতে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে তিনি সর্বশেষ গোল করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন ২০২৪ সালের অক্টোবরে, উয়েফা নেশন্স লিগে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। বিশ্বমঞ্চে গোলের জোয়ার বইয়ে দেওয়া আর্লিং হালান্ড এখন শুধু নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আশার আলোই নন, বরং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য এক জীবন্ত ও মূর্তিমান আতঙ্ক।