ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

রোনালদো যুগের কান্নাভেজা অবসান, নতুন পর্তুগালের পথচলা শুরু


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ০৭ জুলাই, ২০২৬ সময় : ১১:০০ এএম

স্পেনের বিরুদ্ধে নকআউট পর্বের শেষ মুহূর্তের লড়াইয়ে মিকেল মেরিনোর করা নাটকীয় গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে পর্তুগাল। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি কোটি ক্যামেরার লেন্স গিয়ে আটকেছিল ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ওপর। গভীর হতাশা, চরম বিষণ্নতা আর বুকভাঙ্গা আকুতি নিয়ে নিজের চোখের পানি আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন এই পর্তুগিজ মহাতারকা। তবে প্রবল মানসিক শক্তির অধিকারী এই ফুটবল ঈশ্বরও শেষ পর্যন্ত আর পারলেন না; একটু পরেই তার চোখ বেয়ে অশ্রুধারা স্পষ্ট হয়ে নামল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, বিদায়ের সেই চরম মুহূর্তে মাঠের ভেতর রোনালদোকে যেন এক নির্জন, সঙ্গীহীন ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো দেখাচ্ছিল। নিজের দলের তরুণ সতীর্থদের কাছ থেকে তিনি আশানুরূপ কোনো সহানুভূতি বা পাত্তা পেলেন না। কেউ কেউ অত্যন্ত ঠাণ্ডা ও নির্লিপ্ত মাথায় এসে কেবল আনুষ্ঠানিক হাত মেলালেন কিংবা দায়সারা আলিঙ্গন করে চলে গেলেন। মাঠের সেই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, এমন উদাসীন সান্ত্বনা পাওয়ার চেয়ে সতীর্থদের এড়িয়ে যাওয়াই বোধহয় রোনালদোর জন্য অনেক বেশি সম্মানের হতো।

এখন বিশ্ব ফুটবল মহলে বড় প্রশ্ন উঠেছে, পর্তুগালের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ও সবচেয়ে প্রভাবশালী এই ফুটবলারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এমন নীরস, জৌলুসহীন ও ট্র্যাজিক বিদায় কেন হলো? এই করুণ পরিণতির জন্য আসলে প্রধানত দায়ী কে? দলের প্রধান কোচ রবার্তো মার্তিনেজ, মাঠের অন্যান্য সতীর্থরা নাকি খোদ রোনালদো নিজে? ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলাদাভাবে নিখুঁত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এই তিন পক্ষই কোনো না কোনোভাবে এই বিপর্যয়ের জন্য সমান অপরাধে দায়ী। যদিও এই মুহূর্তে দোষারোপের রাজনীতি করে মাঠের নির্মম বাস্তবতাকে আর কোনোভাবেই পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তিতা সত্য এটাই যে, পর্তুগালের ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান এখানেই পুরোপুরি শেষ এবং রোনালদোর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে কখনোই আর সোনালী বিশ্বকাপ ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখা হলো না। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা হয়েও শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ না জেতা কিংবদন্তি বা এলিট ফুটবলারদের তালিকাতেই চিরকালের জন্য আটকে থাকতে হচ্ছে তাকে।

এর আগে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে যখন পর্তুগাল বিদায় নিয়েছিল, তখন কাঁদতে কাঁদতে টানেল দিয়ে মাঠ ছাড়া রোনালদোকে দেখে সবাই ভেবেছিলেন এটাই তার শেষ। কিন্তু নিজের বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবং সমস্ত বৈরী সমালোচনাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রোনালদো দীর্ঘ চার বছর ধরে নিজেকে এই বিশ্বকাপের জন্য কঠোরভাবে প্রস্তুত করেছিলেন। যদিও স্পেনের বিরুদ্ধে আজকের পারফরম্যান্সের পর এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, বুড়ো শরীরের সেই প্রস্তুতি আধুনিক ফুটবলের উচ্চ গতির সঙ্গে লড়াই করার জন্য মোটেও যথেষ্ট ছিল না। পুরো বিশ্বকাপ জুড়েই রোনালদো এই পর্তুগাল দলের ভেতরে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে খেলছিলেন। মাঠের তরুণ সতীর্থরা তাকে সহজে বল পাস দিতে চাচ্ছিলেন না, আবার তিনিও নিজের চিরচেনা গতি হারিয়ে ফেলায় প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ছিটকে সামনে এগোতে পারছিলেন না। এমনকি ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্যক্তিগত কোনো জাদুকরি মুহূর্ত তৈরি করে দলকে উদ্ধার করবেন, সেই অতিমানবীয় সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।

চলমান বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ থেকেই রোনালদোর নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সের পর খোদ দলের ভেতরের সতীর্থদের কথায় এক ধরনের সূক্ষ্ম কটাক্ষের সুর শোনা যাচ্ছিল। মাঠের ভেতরের রসায়ন এবং মাঠের বাইরের আলাপ-আলোচনা থেকে স্পষ্ট মনে হচ্ছিল, রোনালদো যেন সবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে প্রথম একাদশে খেলছেন। তিনি একাই সবার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য কিছু করার চেষ্টা করছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে তেমন কিছুই শেষ পর্যন্ত অর্জিত হয়নি। তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল এবং ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পাওয়া একটি পেনাল্টি গোলই ছিল এবারের বিশ্বকাপে রোনালদোর একমাত্র সম্বল। গোল করে ম্যাচের ভাগ্য পরিবর্তন করতে না পারলেও স্পেনের কাছে হেরে আজ এক অত্যন্ত বিব্রতকর বিশ্বরেকর্ড নিজের সঙ্গী করেছেন তিনি। এই হারের মাধ্যমে ফুটবল বিশ্বকাপে রোনালদোর মোট পরাজয়ের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল আটে। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে আর কোনো ফুটবলারই এত বেশি সংখ্যক ম্যাচ হেরে মাঠ ছাড়ার লজ্জিত রেকর্ডে নাম লেখাননি। বিশ্বকাপে আটটি করে ম্যাচ হারের এই তালিকায় রোনালদোর সঙ্গে যৌথভাবে আছেন ম্যাথিউ লেকি, সন হিউং-মিন, আন্তোনিও কারবাহাল এবং হং মিয়ুং-বো।

এমন এক হতাশাজনক বিশ্বরেকর্ডে নাম লেখানো রোনালদো হয়তো পর্তুগালের এই বিদায়ের একমাত্র কারণ নন, কিন্তু অন্যতম প্রধান কারণ তো বটেই। তবে রোনালদোর চেয়েও বড় আঙুল তুলতে হবে কোচ রবার্তো মার্তিনেজের দিকে। যখন মাঠে কোনো কৌশলই কাজে আসছিল না, তখন কেন তিনি যোগ করা সময়ে গোল করায় অত্যন্ত পারদর্শী ও কার্যকর তরুণ স্ট্রাইকার গনসালো রামোসকে মাঠে নামালেন না, যিনি আগের ম্যাচেই ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত গোল করেছিলেন। কেন সব পারফরম্যান্স ভুলে কেবল নাম দেখে ‘বুড়ো’ রোনালদোকে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে রেখে দিতে হলো? গত বিশ্বকাপে সাবেক কোচ ফার্নান্দো সান্তোস রোনালদোকে বেঞ্চে বসানোর যে অবিশ্বাস্য সাহস দেখিয়েছিলেন, মার্তিনেজ কেন সেই পথে হাঁটতে পারলেন না? মূলত কোচ মার্তিনেজের এক অন্ধ ‘ফ্যান-বয়’ বা ভক্ত হয়ে যাওয়াই বিশ্বকাপে পর্তুগালের এই মহাবিপর্যয়ের প্রধান কারণ। রোনালদোকে পুরো সময় না খেলিয়ে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী টাইম-ম্যানেজমেন্ট করে দুই অর্ধে ভাগ করে নামানো যেত, যাতে তিনি নিজের সংক্ষিপ্ত সময়ে সেরাটা উজাড় করে দিতে পারতেন। কিন্তু দলের চেয়ে রোনালদোর এই অতিমানবীয় অবয়ব বড় হয়ে ওঠাটাই শেষ পর্যন্ত দলের জন্য সর্বনাশ ডেকে এনেছে।

এই পরাজয়ের দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিতিনিয়া ও নুনো মেন্দেসদের মতো তারকা সতীর্থরাও। তারা চাইলেই রোনালদোকে কেন্দ্র করে সুন্দর আক্রমণ সাজাতে পারতেন, কিন্তু মাঠে তারা পরোক্ষভাবে রোনালদোর কাছ থেকে বল দূরে রাখার চেষ্টাই করে গেছেন। অন্যদিকে রোনালদো নিজেও বুঝতে চাইলেন না যে বার্ধক্যের ছাপ আর গতিহীন শরীর নিয়ে জোর করে আধুনিক ফুটবল খেলা যায় না। রোনালদোর এই মলিন পারফরম্যান্স নিয়ে সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড ক্রিস সাটন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বিবিসি ওয়ানে বলেছেন, একজন আধুনিক সেন্টার ফরোয়ার্ডকে মাঠে সারাক্ষণ নড়াচড়া করতে হয়, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে হয়। কিন্তু রোনালদোর মধ্যে এর কিছুই ছিল না। তিনি মাঠে একজন বৃদ্ধ মানুষের মতো কেবল ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন এবং তার কারণে দলের বাকি অসাধারণ খেলোয়াড়দের সময় নষ্ট হয়েছে। সাবেক ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার ওয়েন রুনি অবশ্য একে দেখছেন এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে। রুনির মতে, রোনালদোর মতো একজন মহান খেলোয়াড়কে হারানোর মধ্য দিয়েই পর্তুগাল ফুটবলের এক নতুন এবং স্বাধীন যুগের শুরু হলো, যেখানে অন্য তরুণরা এবার নিজেদের প্রমাণ করার এবং দলের মূল ভরসা হওয়ার সুযোগ পাবে। রোনালদোর শেষের এই অন্ধকার অধ্যায় ভুলে পর্তুগাল তার পুরো ক্যারিয়ারের অসংখ্য মণিমুক্তা আর অনুপ্রেরণাকে সঙ্গী করে আগামী দিনে এক নতুন ও শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, এটাই এখন ফুটবল বিশ্বের প্রত্যাশা।


এ সম্পর্কিত আরো খবর