চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনের কাছে ১-০ গোলের ন্যূনতম ব্যবধানে হেরে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মঞ্চ থেকেই অশ্রুসিক্ত বিদায় নিয়েছে ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি পর্তুগাল। বিশ্বমঞ্চ থেকে দল ছিটকে যাওয়ার পর থেকেই পর্তুগিজদের ডাগআউটে থাকা প্রধান কোচ রবার্তো মার্তিনেজের ম্যাচ কৌশল নিয়ে ফুটবল বিশ্বে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। বিশেষ করে ৪১ বছর বয়সী বুড়ো হাড়ের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ফর্মহীনতার পরও পুরো ৯০ মিনিট মাঠে রেখে দেওয়া নিয়ে সাবেক ফুটবলার ও বোদ্ধাদের তোপের মুখে পড়েছেন তিনি। তবে বিশ্বজুড়ে চলা এই তীব্র সমালোচনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের নেওয়া সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে শতভাগ যৌক্তিক এবং সঠিক বলেই দাবি করেছেন এই স্প্যানিশ মাস্টারমাইন্ড।
ম্যাচ পরবর্তী আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে কোচ মার্তিনেজ তার সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা কৌশলগত কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “দল যখন মাঠে গোল পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছে এবং প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে, তখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো একজন বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ডকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সে পুরো ৯০ মিনিট একটানা খেলার মতো শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ফিট, এতে কোনো সন্দেহ নেই। মাঠের ভেতর গোল না পেলেও শুধু তার রাজকীয় উপস্থিতিই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে সারাক্ষণ আতঙ্কে রাখে এবং তাদের ডিফেন্ডারদের ওপর মানসিক প্রভাব ফেলে। সে সতীর্থদের জন্য ফরোয়ার্ড লাইনে খালি জায়গা তৈরি করে দেয়। সেট পিস কিংবা পেনাল্টি বক্সের ভেতরে যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার অলৌকিক ক্ষমতা তার রয়েছে। তাই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো যুক্তি বা অর্থ ছিল না।”
রোনালদোর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা এবং যেকোনো পরিস্থিতি থেকে গোল করার অনন্য ক্ষমতার ওপর তার যে অগাধ বিশ্বাস ছিল, সেটিও মনে করিয়ে দেন মার্তিনেজ। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমি যখন প্রথম পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দলের কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম, তখন ক্রিশ্চিয়ানোকে দলে রাখা নিয়ে ফুটবল মহলে অনেক সংশয় ও নেতিবাচক আলোচনা ছিল। কিন্তু সে শুধু গোল করা বা সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং দলের প্রতি তার সততা, নিবেদন, ফুটবলীয় প্রতিশ্রুতি আর খেলাটাকে যেভাবে সে নিজের ভেতরে ধারণ করে, সব দিক থেকেই সে বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় একজন আদর্শে পরিণত হয়েছে। আমাদের উচিত তার এই ফুটবলীয় নিবেদনকে উদযাপন করা।”
পর্তুগিজ ডাগআউটের এই প্রধান কৌশলী আরও যোগ করেন যে, ফুটবল বিশ্ব এখন একজন জীবন্ত আইকনকে চোখের সামনে খেলতে দেখছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো ফুটবলীয় মাপকাঠির খেলোয়াড় বিশ্ব ইতিহাসে খুব বেশি একটা আসেনি এবং ভবিষ্যতেও আসবে না। এই বিশ্বকাপে দেশের জার্সি গায়ে সে মাঠ ও মাঠের বাইরে যা কিছু করেছে, তার জন্য পুরো পর্তুগাল জাতিসহ ফুটবল বিশ্বের তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। খেলোয়াড় হিসেবে, সুযোগ্য অধিনায়ক হিসেবে, এমনকি একজন অসাধারণ মানুষ হিসেবেও সে বিশ্ব ফুটবলে আজীবন এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কোচের এমন মন্তব্য পর্তুগালের বিদায়ী ক্ষতকে কিছুটা প্রশমিত করার চেষ্টা করলেও রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।