স্পোর্টস ডেস্ক:
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর হাইভোল্টেজ ম্যাচে আজ আমেরিকার আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মিশরের মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ফুটবল লড়াইয়ের আগে ফুটবল বিশ্বে নতুন করে ফিরে আসছে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের এক অবিস্মরণীয় ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়। কারণ, আজ থেকে ঠিক ২১ বছর আগে এই আফ্রিকার দেশ মিশরের বিপক্ষেই যুব বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবার আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। আর সেই ম্যাচেই আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক অঙ্গনে করেছিলেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল, যা পরবর্তীতে এক জীবন্ত কিংবদন্তি ক্যারিয়ারের সূচনালগ্ন হিসেবে ফুটবল ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ঐতিহ্যবাহী আকাশী-সাদা জার্সিতে লিওনেল মেসির পথচলা মূলত শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ দিয়ে। তবে ২০০৫ সালের ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে মিশরের বিপক্ষে ম্যাচটি তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে আজীবন ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। সেবার টুর্নামেন্টে প্রথমবার দলের শুরুর একাদশে নেমেই অসাধারণ এক গোলের দেখা পান তরুণ মেসি এবং দলকে পূর্ণ পয়েন্ট ও জয়ের পথে অনেকখানি এগিয়ে দেন।
সেই অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টের শুরুটা অবশ্য ভীষণ হতাশাজনক ও হতাশার ছিল আর্জেন্টিনার জন্য। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১-০ গোলের ব্যবধানে হেরে চরম ব্যাকফুটে চলে যায় তারা। তখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ফুটবলার ছিলেন মাত্র ১৪ বছর বয়সে মেজর লিগ সকারে অভিষেক হওয়া ফুটবল সেনসেশন ফ্রেডি আডু, যাকে বিশ্ব মিডিয়া অনেকে ভবিষ্যতের ‘নতুন পেলে’ বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায় মূল দলে খেলা শুরু করলেও মেসি তখনও বিশ্বমঞ্চে ছিলেন নিজেকে প্রমাণের অপেক্ষায় থাকা এক আনকোরা তরুণ প্রতিভা। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে কোচ তাঁকে প্রথমার্ধে বেঞ্চে রাখায় দ্বিতীয়রদ্ধে বদলি হিসেবে নেমেও তিনি দলের হারের ফল বদলাতে পারেননি।
তবে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে আফ্রিকার দেশ মিশরের বিপক্ষে শুরু থেকেই খেলার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েই নিজের অসাধারণ সামর্থ্যের প্রমাণ দেন মেসি। ম্যাচের ৪৭তম মিনিটে হুলিও বারোশোর নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক গোল করে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। পরে দলের অভিজ্ঞ তারকা পাবলো জাবালেতা আরও একটি গোল করলে ২-০ ব্যবধানের সহজ জয় নিশ্চিত হয় আলবিসেলেস্তেদের। সেই জয়ের হাত ধরেই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়। ম্যাচের শেষ দিকে দারুণ খেলা মেসিকে তুলে নিয়ে তাঁর পরিবর্তে লুকাস বিগলিয়াকে মাঠে নামান তৎকালীন কোচ।
মিশরের বিপক্ষে ক্যারিয়ারের প্রথম বৈশ্বিক গোলের পর পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই মেসি ছিলেন রীতিমতো জাদুকরী ও দুর্দান্ত ছন্দে। শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ছয়টি গোল করে তিনি একাই জিতে নেন সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’। পাশাপাশি টুর্নামেন্টসেরা সেরা খেলোয়াড়ের ‘গোল্ডেন বল’ ট্রফিও ওঠে তাঁর জাদুকরী হাতে। বিশেষ করে ফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল এবং সেমিফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিপক্ষে এক চোখধাঁধানো গোল করে আর্জেন্টিনাকে অনূর্ধ্ব-২০ যুব বিশ্বকাপের শিরোপা জেতাতে প্রধান ভূমিকা রাখেন তিনি। আজ দুই দশকেরও বেশি সময় পর আবারও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সেই একই প্রতিপক্ষ মিশরের মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা। ফলে আজকের ম্যাচটি শুধু কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার জীবন-মরণ লড়াই নয়, বরং মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এক ঐতিহাসিক ও আবেগী সূচনার স্মৃতিকেও ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।