আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি
দেশের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম ও নজিরবিহীন এক আর্থিক কেলেঙ্কারির চিত্র সামনে এসেছে। পিরোজপুর জেলায় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বরাদ্দকৃত সাড়ে তিন হাজার কোটি (৩৫০০ কোটি) টাকা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হরিলুট করার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ডিবিসি নিউজ (DBC News)-এর ধারাবাহিক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই মেগা দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ পাওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মাঠপর্যায়ে কোনো কাজ না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, চরম নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং নথিপত্রে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে। আর এই বিশাল তহবিল আত্মসাতের মাস্টারমাইন্ড এবং মূল হোতা হিসেবে আঙুল উঠেছে এলজিইডির বহুল বিতর্কিত কর্মকর্তা ও বঙ্গবন্ধু পরিষদ এলজিইডি শাখার সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী রেজাউল বারির বিরুদ্ধে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মেগা চুরির বিরুদ্ধে যেখানে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল, সেখানে সমস্ত নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তাকে পুরস্কারস্বরূপ এলজিইডির অত্যন্ত প্রভাবশালী ‘অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এই বিতর্কিত প্রমোশন ও পদায়নের পর এলজিইডির ভেতরে ও বাইরে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
হরিলুটের অভিনব কৌশল: কাগজে উন্নয়ন, পকেটে টাকা
ডিবিসি নিউজের অনুসন্ধানী তথ্য এবং স্থানীয় সূত্রগুলোর সরবরাহকৃত নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পিরোজপুর জেলা ও এর আশেপাশের উপজেলাগুলোতে এলজিইডির অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, কালভার্ট ও সেতু সংস্কারসহ একাধিক মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এই প্রকল্পগুলোর মোট আর্থিক মূল্যমান ছিল প্রায় ৩৫০০ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৌশলী রেজাউল বারি পিরোজপুরে দায়িত্বে থাকাকালীন তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব এবং এলজিইডির ওপরমহলের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে কাজে লাগিয়ে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি কাজের গুণগত মান যাচাই এবং শতভাগ কাজ বুঝে নেওয়ার পর চূড়ান্ত বিল পরিশোধের নিয়ম থাকলেও, রেজাউল বারির ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। পিরোজপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অন্তত ডজনখানেক সড়ক ও সেতুর ভৌত অবকাঠামো সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় কার্পেটিংয়ের দুই মাসের মধ্যেই রাস্তা ধসে পড়েছে, কোথাও কোথাও সেতুর গার্ডারে ফাটল ধরেছে, আবার কিছু কিছু প্রকল্প কেবল কাগজে-কলমে ফাইল বন্দি রেখেই শতভাগ সরকারি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারদের সাথে গোপন আঁতাত এবং নিজস্ব লোক দিয়ে বেনামী লাইসেন্সে কাজ করিয়ে এই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা পকেটস্থ করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে।
রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও সিন্ডিকেট রাজত্ব
প্রকৌশলী রেজাউল বারি দীর্ঘদিন ধরে এলজিইডির ভেতরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আসছিলেন। তিনি বিগত সময়ে ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ এলজিইডি শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বা সমমানের প্রভাবশালী পদে আসীন থাকার সুবাদে কাউকেই তোয়াক্কা করতেন না। বিভাগীয় কোনো কর্মকর্তা তাঁর অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে তাকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে হয়রানি বা দূরবর্তী বদলি করার হুমকি দেওয়া হতো। এই রাজনৈতিক রক্ষাকবচ ব্যবহার করেই তিনি পিরোজপুরে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার এই মহাসাম্রাজ্য গড়ে তোলেন এবং সরকারের বিপুল অর্থ লোপাট করেন।
শাস্তির বদলে মহা-পুরস্কার: অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি!
সাধারণত কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শত বা হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা বা সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করার নিয়ম। কিন্তু প্রকৌশলী রেজাউল বারির ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। ডিবিসি নিউজের প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে মেগা চুরির অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপনের পরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা এলজিইডি প্রশাসন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তো নেয়ইনি, বরং অতি সম্প্রতি এক রহস্যময় আদেশে তাকে এলজিইডির অন্যতম শীর্ষ ও নীতিনির্ধারণী পদ ‘অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী’ হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডেস্কে পদায়ন করা হয়েছে। এই ঘটনাকে দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।
সরকার প্রধানের অবগতি ও জাতির প্রশ্ন
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে তথ্যটি বেরিয়ে এসেছে তা হলো—মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পিরোজপুরের এই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার মেগা দুর্নীতি ও প্রকৌশলী রেজাউল বারির সম্পৃক্ততার বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত আছেন। দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা দেশের সাধারণ মানুষের জানা। স্বয়ং সরকার প্রধান বিষয়টি জানার পরও কোন অদৃশ্য শক্তির ইশারায় এবং কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন চিহ্নিত ও অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে পদোন্নতি দেওয়া হলো, তা আজ এক বিরাট রহস্য। এই প্রশ্ন এখন সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের। মানুষ জানতে চায়, তবে কি দুর্নীতির সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে তারা স্বয়ং সরকার প্রধানের সদিচ্ছাকেও বুড়ো আঙুল দেখাতে পারে?
টিআইবির তীব্র নিন্দা ও কড়া হুঁশিয়ারি
এই নজিরবিহীন পদোন্নতির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. মোহাম্মদ বদিউজ্জামান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় দৈনিক আকাশ জমিনকে বলেন:
"যেখানে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির জন্য কঠোরতম আইনি শাস্তি পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে তাকে উল্টো পুরস্কৃত করে পদোন্নতি দেওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক। এই ধরণের সিদ্ধান্ত দেশের সৎ কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দেবে এবং অপরাপর দুর্নীতিবাজদের আরও বড় বড় চুরির কাজে উৎসাহিত করবে। যেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন, তাই আমরা আশা করি তিনি অবিলম্বে তাঁর বিশেষ ক্ষমতা ও সাংবিধানিক এখতিয়ার ব্যবহার করে এই বিতর্কিত প্রমোশন বাতিল করবেন এবং এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেবেন।"
আইনি ভিত্তি ও অপরাধের গভীরতা
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৌশলী রেজাউল বারির বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধানে যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে, তা দেশের প্রচলিত আইনে গুরুতর এবং অমার্জনীয় অপরাধ। নিচে তাঁর বিরুদ্ধে প্রযোজ্য প্রধান আইনি ধারাগুলো উল্লেখ করা হলো:
দণ্ডবিধি ৪০৯ (Criminal Breach of Trust): সরকারি কর্মচারী কর্তৃক জনগণের গচ্ছিত আমানত ও বিশ্বাসের অবমাননা করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অপরাধ। এই ধারায় সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪, ধারা ৫(২): অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের বা অন্য কারো আর্থিক সুবিধার জন্য সরকারি অর্থের ক্ষতি সাধন করা।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা: যেকোনো বড় ধরণের দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে বা তদন্তাধীন থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পদোন্নতি অবিলম্বে স্থগিত রেখে বাধ্যতামূলক বিভাগীয় তদন্ত শুরু করার স্পষ্ট আইনি নির্দেশনা রয়েছে, যা এই ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করা হয়েছে।
অবিলম্ব করণীয়: ৫ দফা সুপারিশ ও দাবি
পিরোজপুরের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার এই জাতীয় ক্ষতি পুনরুদ্ধার এবং এলজিইডির ভাবমূর্তি রক্ষা করতে দৈনিক আকাশ জমিনের পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত জরুরি সুপারিশসমূহ পেশ করা হলো:
১. দুদকের মেগা তদন্ত: দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) অবিলম্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ টিম গঠন করে পিরোজপুরের বিতর্কিত মেগা প্রকল্পগুলোর সমস্ত ফাইল, বিল-ভাউচার এবং বাস্তব কাজের গুণগত মান পরীক্ষা করে একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত রিপোর্ট পেশ করতে হবে।
২. পদোন্নতি অবিলম্বে স্থগিত: তদন্তের স্বার্থে এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে প্রকৌশলী রেজাউল বারির সদ্যপ্রাপ্ত ‘অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী’ পদের পদোন্নতি অবিলম্বে আদেশ জারির মাধ্যমে স্থগিত করতে হবে এবং তাকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করতে হবে।
৩. অবৈধ সম্পদের হিসাব নিকাশ: শুধু পিরোজপুর নয়, অভিযুক্ত প্রকৌশলী এবং তাঁর পরিবারের নামে দেশ-বিদেশে থাকা সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর এবং আয়-বহির্ভূত সম্পদের হিসাব ও ব্যাংকিং লেনদেন খতিয়ে দেখতে হবে।
৪. স্বাধীন টেকনিক্যাল ও ফিন্যান্সিয়াল অডিট: পিরোজপুরের ঐ নির্দিষ্ট সময়ের সমস্ত কাজের ওপর একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, বহিঃস্থ ও কারিগরি অডিট (Technical Audit) পরিচালনা করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে।
৫. বিভাগীয় ব্যবস্থা: যেসকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা প্রশাসনিক ব্যক্তি যাচাই-বাছাই না করে এই বিতর্কিত পদোন্নতির ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন, তাদেরকেও তদন্তের আওতায় এনে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে হবে।
জাতির সম্পদ এভাবে হরিলুট হতে দেওয়া যায় না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপে এই মেগা দুর্নীতির বিচার হবে এবং দেশের টাকা দেশে ফিরবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী জনগণের।
আকাশজমিন / আরআর