রফিকুল ইসলাম রাজু
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শেষ ষোলোর এক রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে আজ রাতে আটলান্টার ঐতিহ্যবাহী মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও আফ্রিকার অন্যতম পরাশক্তি মিসর। মাঠের এই জমজমাট লড়াই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য স্রেফ দুটি দেশের ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্বের যুদ্ধ নয়; বরং এটি আধুনিক ফুটবলের দুই মহানায়ক লিওনেল মেসি এবং মোহাম্মদ সালাহর মধ্যকার এক পরম দ্বৈরথ। এর পাশাপাশি এই ম্যাচটি লিভারপুলের দুই প্রাক্তন সতীর্থ ও গভীর বন্ধুর একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার এক আবেগঘন গল্পও বটে। আজ রাতের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছে।
এই ম্যাচের গল্পটা শুরু হতে পারে ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলের চেনা জিমনেসিয়ামের একটি নিয়মিত দৃশ্যপট থেকে। অ্যানফিল্ডের সেই জিমে প্রতিদিন ভোরেই একটি চেনা প্রশ্ন শোনা যেত, ‘মো, তুমি ঘুমাও কখন?’ প্রশ্নকর্তা আর কেউ নন, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার। তিনি প্রতিদিন জিমনেসিয়ামে ঢুকে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোহাম্মদ সালাহকে ভোরবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রম করতে ও ঘাম ঝরাতে দেখতেন। আর প্রতিদিন আগে থেকেই সালাহকে জিমের ভেতরে আবিষ্কার করে ম্যাক আলিস্টার এই মজার প্রশ্নটি করতেন। সালাহর উত্তরটাও ছিল একজন খাঁটি তপস্বীর মতো। মিসরীয় এই ফরোয়ার্ডের সহজ দর্শন ছিল— দৈনিক সাড় সাড়ে ছয় ঘণ্টার বেশি ঘুমালে নাকি তাঁর শরীর অলস ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সেই কঠোর পরিশ্রমী এবং শৃঙ্খলিত মানুষটার নামই মোহাম্মদ সালাহ, যিনি আজ রাতে তাঁর পুরোনো বন্ধুর দেশ আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ গুঁড়িয়ে দিতে মাঠে নামবেন।
আজ রাতে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় যখন এই দুই বন্ধু মুখোমুখি হবেন, তখন লিভারপুলের সেই চেনা জিম থেকে এই মাঠের দূরত্বটা কেবল ভূখণ্ডের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা রূপ নেবে এক গভীর আবেগ ও পেশাদারিত্বের দ্বৈরথে। প্রিয় বন্ধুর মুখোমুখি হওয়ার আগে ম্যাক আলিস্টারও তাই বন্ধুত্বের সুরে প্রতিপক্ষের ভাষায় এক আবেগী বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই ঐতিহাসিক ম্যাচের পর হয়তো ওর সঙ্গে আর দেখাই হবে না অনেক দিন। তাই আমি ওকে ব্যক্তিগতভাবে মেসেজ দিয়েছি, এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে ও যেন জিমে একটু কম পরিশ্রম করে।’ দুজনের আজকের এই লড়াইয়ের পর মাঠের বাইরে বা ভেতরে দ্রুত আর দেখা হওয়ার সুযোগ আসলেই খুব কম। কারণ মোহাম্মদ সালাহ সদ্য সমাপ্ত ক্লাব মরশুম শেষেই, অর্থাৎ এই বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে লিভারপুলের সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের চুক্তি শেষ করে ক্লাব ছেড়ে দিয়েছেন।
তবে আজকের এই মেগা ম্যাচটি স্রেফ দুই বন্ধুর বিচ্ছেদের আগে একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার সাধারণ গল্প নয়। আর্জেন্টিনার যেকোনো ম্যাচের মতো এখানেও সবকিছুর শুরুতে এবং কেন্দ্রে একজনের নামই অবধারিতভাবে লিখতে হয়, তিনি হলেন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সে এসেও যাঁর জাদুকরী বাঁ পা এখনো সবুজ মাঠে নান্দনিক কবিতা লেখে, যাঁর প্রতিটি অবিশ্বাস্য স্পর্শে বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাস একটু একটু করে নড়েচড়ে বসে। চলমান এই বিশ্বমঞ্চে মেসি ইতিমধ্যেই অনন্য ফর্মে থেকে ৭টি গোল করে ফেলেছেন। এর মাধ্যমে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে সাত বা তার বেশি গোল করার এক অনন্য নজিরবিহীন বিশ্বরেকর্ড এককভাবে নিজের করে নিয়েছেন তিনি। পরে অবশ্য চলমান আসরেই মেসির এই অতিমানবীয় কীর্তিতে ভাগ বসিয়েছেন ফ্রান্সের গতিদানব কিলিয়ান এমবাপ্পেও। এই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ জয়ের মূল লড়াইয়ে এখন মেসির সঙ্গে সমান তালে আছেন নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হলান্ডও। তাঁরও গোলসংখ্যা ইতিমধ্যেই ৭-এ গিয়ে ঠেকেছে, যা গতকাল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী স্পষ্ট।
আজ রাতের ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে লিওনেল মেসি আর মাত্র একটি গোল করতে পারলেই ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের কিংবদন্তি ফুটবলার গিয়ের্মো স্তাবিলের পাশে বসার অনন্য গৌরব অর্জন করবেন। এক বিশ্বকাপে আটটি গোল করার এই কীর্তি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে স্তাবিলের পর আর কেউ স্পর্শ করতে পারেননি। কিন্তু নতুন করে ইতিহাস লেখার এই মহালগ্নে মেসির শরীরটাকেও তো শতভাগ সায় দিতে হবে। কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো এক চরম ধুঁকতে থাকা লড়াইয়ের পর মেসি নিজেই সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের শারীরিক ক্লান্তির কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। একই সুরে কথা বলেছেন তাঁর তরুণ সতীর্থরা এবং আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনিও। কেপ ভার্দের বিপক্ষে সেই ধুঁকতে থাকা ম্যাচটি একই সঙ্গে ফুটবল বিশ্বে সন্দেহের এক নতুন বীজও বুনে দিয়েছে যে, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বর্তমান জয়যাত্রা কাগজে-কলমে যতটা নিখুঁত ও সহজ দেখাচ্ছে, বাস্তবে কি আলবিসেলেস্তেরা ততটা অপরাজেয় ও নিখুঁত?
প্রতিপক্ষ মিসরও কিন্তু এই শেষ ষোলোর মঞ্চে সহজে আসেনি, তারাও এসেছে অনেক ভুগতে ভুগতে এবং কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে। নকআউট পর্বের আগের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে ড্র থাকার পর স্নায়ুক্ষয়ী টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জিতেছে তারা। সেই ম্যাচে পুরো ১২০ মিনিট মাঠে থেকে জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করতে হয়েছিল মিসরীয় ফারাওদের। দলের সেরা তারকা সালাহর হ্যামস্ট্রিংয়ের তীব্র চোটের শঙ্কা ও ঝুঁকি ছিল, তবুও দলের প্রয়োজনে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও মাঠ ছাড়েননি এবং টাইব্রেকারে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় গোলও করেছেন। তাই আজকের এই ম্যাচের মূল আকর্ষণীয় ট্যাগলাইন দাঁড়িয়েছে: কিংবদন্তি মেসি বনাম ফারাও সালাহ।
আর্জেন্টিনা ম্যাচের ঠিক পূর্বমুহূর্তে মিসরের টিম ডিরেক্টর ইব্রাহিম হাসান অবশ্য বিশ্বজয়ী মেসির নাম শুনতেই বেশ গর্ব ও আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছেন, ‘ওদের দলে যদি বিশ্বসেরা মেসি থাকে, তবে আমাদের দলে আছে মোহাম্মদ সালাহ। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের স্কোয়াডে আছে নিজেদের আরও ২৬ জন মেসি!’ এটি নিঃসন্দেহে আফ্রিকার দলটির জন্য এক পরম গর্বের ভাষা, তবে কোনোভাবেই এটিকে অন্ধ অহংকার বলা চলে না। কারণ যে মিসর দল এই প্রথম নিজেদের দীর্ঘ বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা চার ম্যাচে অপরাজিত থেকে শেষ ষোলোর ঐতিহাসিক টিকিট নিশ্চিত করেছে, তাদের মুখে এমন আত্মবিশ্বাসী বাণীই তো সবচেয়ে বেশি মানায়।
মোহাম্মদ সালাহর আন্তর্জাতিক ফুটবলের গল্পটা হয়তো মেসির মতো সংখ্যায় বা ট্রফিতে ততটা চকচকে ও ভারী নয়, কিন্তু গভীরতার দিক থেকে তা সমান তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি বিশ্বকাপে চার ম্যাচে মাঠে নেমে তিনি নিজে করেছেন ২ গোল, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ১টি অ্যাসিস্ট এবং প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে সুনির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি করেছেন অন্তত ১৬টি। বয়সের বিচারে সালাহ লিওনেল মেসির চেয়ে প্রায় ৫ বছরের ছোট হতে পারেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাস্তবতায় এটি তাঁর ক্যারিয়ারেরও শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে। আর নিজের শেষ আন্তর্জাতিক মঞ্চ কে না মনে রাখার মতো করে রাঙাতে চায়! মিসরের সামনে আজ এক সোনালী সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। ক্যামেরুন, সেনেগাল, ঘানা ও মরক্কোর পর ইতিহাসের পঞ্চম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখার এক অনন্য হাতছানি এখন সালাহদের সামনে।
ফুটবল ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, আর্জেন্টিনা ও মিসর মূল বিশ্বকাপে এর আগে কখনো একে অপরের মুখোমুখি হয়নি। আন্তর্জাতিক স্তরে দুই দলের সবশেষ দেখা হয়েছিল সুদূর ২০০৮ সালে কায়রোতে একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে, যেখানে আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে জয়লাভ করেছিল। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে আফ্রিকান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার রেকর্ড বেশ ঈর্ষণীয়। তারা বিশ্বকাপে আফ্রিকান দেশগুলোর বিরুদ্ধে টানা আট ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে, যার মধ্যে চলমান আসরেই তারা গ্রুপ পর্বে ও নকআউটে হারিয়েছে আলজেরিয়া আর কেপ ভার্দেকে। কিন্তু ফুটবলীয় ইতিহাস কখনো ভবিষ্যতের শতভাগ জামিন বা নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
আজ রাতের এই মহা-লড়াইয়ে যে দল জয়ী হবে, তাদের জন্য কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চ কানসাস সিটিতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সুইজারল্যান্ড অথবা কলম্বিয়া। তবে সেই দূরবর্তী হিসাবের আগে আটলান্টার আজকের এই মাঠের লড়াইটা শুধু দুটি ভিন্ন দলের নয়, বরং সমসাময়িক ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুটি মানুষের। একজন লিওনেল মেসি, যিনি মাঠে নামবেন ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন সোনালী পাতা লেখার উদ্দেশ্যে। আর অন্যজন মোহাম্মদ সালাহ, যিনি ফুটবল বিশ্বের সামনে আজ রাতে আবারও প্রমাণ করতে চাইবেন— মহাতারকার পাশে দাঁড়িয়েও নিজের ফুটবলীয় আলোয় পুরো বিশ্বকে অনায়াসে রাঙিয়ে দেওয়া যায়।
আকাশজমিন/ আরআর