ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

ফুটবলের বিশ্বায়ন নাকি ধনকুবেরদের সার্কাস: কাঠগড়ায় ফিফা প্রধান জিয়ান্নি


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ০৯ জুলাই, ২০২৬ সময় : ১০:০৩ এএম

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনেতা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে নিজের অত্যন্ত ‘প্রিয় বন্ধু’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে পরম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এক যুগের কাছাকাছি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার রাজসিংহাসনে আরোহণ করে থাকলেও, চলমান ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সম্ভবত ক্যারিয়ারের সবচেয়ে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন তিনি। ব্যক্তিগত বিলাসবহুল জেট বিমানে চড়ে বিশ্বকাপের এক ভেন্যু থেকে অন্য ভেন্যুতে ডানা মেলে চষে বেড়ানো এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সর্বদা তুমুল সক্রিয় থাকা এই ব্যক্তিত্বের দিকে প্রশংসার পাশাপাশি নিন্দার জুতোও কম বর্ষিত হচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড স্থগিত করার নজিরবিহীন কাণ্ড ছাড়াও চলতি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে নানা বিতর্কিত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইউরোপিয়ান সংসদে রীতিমতো আনুষ্ঠানিক তদন্তের দাবি তুলেছেন ৩৫ জন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য। এতক্ষণে নিশ্চয়ই ফুটবলপ্রেমীদের বুঝতে বাকি নেই কার কথা বলা হচ্ছে। তিনি আর কেউ নন, বিশ্ব ফুটবলের নীতি নির্ধারণী সংস্থা ফিফার সর্বোচ্চ দূরদর্শী ও ক্ষমতাধর নেতা তথা বর্তমান প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। অথচ আজ থেকে মাত্র এক দশক আগেও এই জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো ছিলেন ইউরোপের এক সাধারণ ও নিরীহ আইনজীবী।

যদি একটু পেছনের ইতিহাসে ফিরে তাকানো যায়, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন তিনি প্রথমবার ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হন, তখন ওয়েলসের কার্ডিফ শহরের একটি বিলাসবহুল হোটেলের বারে উপস্থিত সাংবাদিকদের নিজ পকেটের টাকা দিয়ে বিয়ার খাইয়ে এক ঘরোয়া উল্লাসে মেতে উঠেছিলেন। তৎকালীন সময়ে ভয়াবহ ঘুষ ও দুর্নীতির কলঙ্কিত কেলেঙ্কারিতে সেপ ব্ল্যাটার যুগের নাটকীয় পতনের পর, ইনফ্যান্তিনোকে ফুটবল বিশ্বের এক নতুন ও ‘জনবান্ধব’ মুখ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল, যিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব সহজে মিশে যেতে পারতেন। ফুটবলের ধূলিসাৎ হওয়া সুনাম পুনরুদ্ধার করতে পুরো বিশ্ব তখন এই নতুন নেতার ওপর অন্ধের মতো ভরসা করেছিল।

সেই ঘটনার ১০ বছর পর, সেই সুইস-ইতালীয় আইনজীবী এখন বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত হয়েছেন। বর্তমানে ফিফার প্রধান হিসেবে তার বার্ষিক আনুষ্ঠানিক আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সৌদি আরবের প্রভাবশালী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো শীর্ষ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তার গভীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সখ্যতার কথা এখন আর কারোরই অজানা নয়। এমনকি কাতার সরকারের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে দেওয়া বিশেষ ব্যক্তিগত জেটে চড়েই তিনি বিশ্বজুড়ে যাতায়াত করেন।

২০১৬ সালে প্রথমবার ফিফার সভাপতি পদে বসার পর ইনফ্যান্তিনো আরও দুই দফায়—যথাক্রমে ২০১৯ এবং ২০২৩ সালে সম্পূর্ণ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনরায় পুননির্বাচিত হন। আগামী ২০২৭ সালের নির্বাচনেও তিনি আবার সভাপতি পদের জন্য লড়াই করার প্রকাশ্য ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন এবং ধারণা করা হচ্ছে, এবারও কোনো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই তিনি নিজের আসনটি ধরে রাখবেন। ফিফার বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, যেকোনো সভাপতি সর্বোচ্চ তিনবার অর্থাৎ চার বছর করে মোট ১২ বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে ২০১৬ সালে সেপ ব্ল্যাটারের অনাকাঙ্ক্ষিত বিদায়ের পর নিয়মিত নির্বাচনী চক্রের বাইরে এসে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নিয়েছিলেন ইনফ্যান্তিনো। সেই বিশেষ আইনি মারপ্যাঁচে তার প্রথম তিন বছরের মেয়াদকে এই ১২ বছরের মূল সীমার মধ্যে ধরা হয়নি। ফলে তার অফিশিয়াল ১২ বছরের মেয়াদ গণনা শুরু হয়েছে ২০১৯ সাল থেকে, যা তাকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার আইনি বৈধতা দেয়।

তবে বিখ্যাত ক্রীড়া গণমাধ্যম ইএসপিএনের সঙ্গে আলাপকালে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ২০৩১ সালে চতুর্থ মেয়াদে প্রার্থী হওয়ার জন্য ফিফার মূল সংবিধান সংশোধন করার কোনো গোপন বা প্রকাশ্য পরিকল্পনা ইনফ্যান্তিনোর এই মুহূর্তে নেই। এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বছরের পর বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়ানোর কারণে সৃষ্ট প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক ধকল, যা তাকে ক্লান্ত করে তুলছে।

ক্ষমতাধর ও বিতর্কিত বিশ্বনেতাদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার কারণে ইনফ্যান্তিনো বহুবার বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের দিকে সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বিশেষ ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ বা শান্তি পুরস্কার চালুর ঘোষণা ক্রীড়ামোদীদের মাঝে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। তবে ফুটবল বলয়ের ভেতরে তার ক্ষমতা এতটাই সুদৃঢ় যে, প্রকাশ্যে তার কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা বা সমালোচনা করার ঘটনা খুবই বিরল। ২০২৬ বিশ্বকাপের অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া টিকিট নীতির পক্ষে যখন ইনফ্যান্তিনো অবস্থান নেন, তখন ইএসপিএন একটি শীর্ষ জাতীয় ফুটবল সংস্থার মতামত জানতে চাইলে তারা স্রেফ ভয়ের চোটে স্পষ্ট জবাব দেয়, ‘আমরা এই স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।’

অবশ্য এমন সর্বজনীন নীরবতার মধ্যেও এক জ্বলন্ত ব্যতিক্রম ছিলেন নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের (এনএফএফ) সাহসী নারী সভাপতি লিসে ক্লাভেনেস। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফা পিস প্রাইজ দেওয়ার একপেশে সিদ্ধান্তকে ‘ফিফার চিরন্তন রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার মূল নীতিমালার চরম লঙ্ঘন’ বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ তোলেন যে, এই স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ফিফার ভেতরে কোনো ধরনের যথাযথ আইনি বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

অন্যদিকে, বিশ্ব ফুটবলারদের সবচেয়ে বড় পেশাদার সংগঠন ফিফপ্রোর তৎকালীন সভাপতি সার্জিও মার্চিও গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপ চলাকালে ‘দ্য ম্যান হু থিংকস হি’স গড’ (যিনি নিজেকে ঈশ্বর ভাবেন) শিরোনামে একটি কঠোর ও বিস্ফোরক বিবৃতি দিয়ে ইনফ্যান্তিনোর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। সার্জিও মার্চির ভাষায়, ‘ইনফ্যান্তিনো আসলে বাস্তব দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের তৈরি এক কাল্পনিক ও আলাদা জগতে বাস করেন। তার কাছে ফুটবল বা ফুটবলারদের চেয়ে এই বিশাল বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক আয়োজনগুলোই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

তবুও বিশ্ব ফুটবলের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সিংহভাগই ইনফ্যান্তিনোর কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি। আর এই নীরবতার সুযোগেই তিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে বিশ্বকাপের জমকালো ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে বিশেষ রাজনৈতিক সম্মান জানানোর সাহস পান, ২০২৬ বিশ্বকাপের বিতর্কিত ও আকাশচুম্বী টিকিট মূল্য নির্ধারণে অনুমোদন দেন এবং ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের একক আয়োজক হিসেবে সৌদি আরবকে চূড়ান্ত করার পুরো প্রক্রিয়ার প্রধান নেতৃত্ব দেন।

২০৩৪ বিশ্বকাপের বিডিং বা আয়োজক দেশ নির্ধারণের প্রক্রিয়াটিও ছিল চরম বিতর্কিত। ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর ইনফ্যান্তিনো আকস্মিকভাবে বিড আহ্বান করেন এবং মহাদেশীয় রোটেশন বা আবর্তনের অদ্ভুত যুক্তি দেখিয়ে আবেদনের সুযোগ সীমাবদ্ধ করে দেন শুধু এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য। অস্ট্রেলিয়া শুরুতে এই বিশ্বকাপের জন্য বিড করার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবলেও, শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির বিপক্ষে না যাওয়ার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে সৌদি আরব একমাত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থেকে যায় এবং ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ফিফার একটি বিশেষ কংগ্রেসে কোনো ভোট ছাড়াই দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ফিফা সভাপতির মর্যাদাপূর্ণ পদে নিজের সফল ১০ বছর পূর্তি অত্যন্ত সাড়ম্বরে উদ্‌যাপন করেছেন ইনফ্যান্তিনো। এই উপলক্ষ্যটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ফিফা বিশ্বজুড়ে বড় পরিসরে এক প্রচার অভিযান চালায়। তৈরি করা হয় বিশেষ ‘ইনফ্যান্টিনো ১০’ নামক লোগো এবং প্রকাশ করা হয় ৩০ মিনিটের একটি দীর্ঘ তথ্যচিত্র, যেখানে বিশ্বের বাঘা বাঘা কর্মকর্তা, সাবেক কিংবদন্তি ফুটবলার ও নামী কোচদের শুভেচ্ছা বার্তা যুক্ত করা হয়েছে। ফিফার তৈরি সেই অফিশিয়াল তথ্যচিত্রে দাবি করা হয়, ‘সভাপতি হিসেবে ১০ বছর মানে অগ্রগতির ১০ বছর। সংগঠনের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও কলঙ্কিত সময়ে দায়িত্ব নেওয়া থেকে শুরু করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজনের সফল প্রস্তুতি—এটাই ফিফার নেতৃত্বে জিয়ান্নি ইনফ্যান্টিনোর এক দশকের সোনালী গল্প।’

তবে এই জমকালো প্রচারণার আড়ালে ২০২৬ বিশ্বকাপ জুড়ে একের পর এক জন্ম নেওয়া নতুন বিতর্ক এবং সেসবের কেন্দ্রে জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর স্বৈরাচারী ভূমিকা নতুন করে ফুটবল মহলে বড় প্রশ্ন তুলেছে—ফিফা সভাপতির চেয়ারে তার গত ১০ বছরের আসল গল্পটা আসলে কী? নির্বাচনের সময় সাধারণ দেশগুলোকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কি তিনি আদেও বাস্তবায়ন করেছেন? নাকি তিনি কেবল একজন অত্যন্ত চতুর ও দক্ষ কর্পোরেট সেলসম্যান বা বিক্রেতা, যিনি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আবেগ জড়ানো ক্রীড়া আসর বিশ্বকাপকে কোটিপতি ও অভিজাতদের বিনোদনের জন্য সাজানো এক বিশাল বাণিজ্যিক প্রদর্শনীতে বা সার্কাসে পরিণত করেছেন?

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ২০১৬ সালে ইনফ্যান্তিনো যখন ফিফার দায়িত্বভার কাঁধে নেন, তখন এই বৈশ্বিক সংস্থাটি ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও জঘন্যতম দুর্নীতিকাণ্ডে সম্পূর্ণ জর্জরিত ও দেউলিয়া ছিল। এর ঠিক এক বছর আগে, ২০১৫ সালে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের এক চাঞ্চল্যকর তদন্তে ফিফার শীর্ষ কর্তাদের জড়িত থাকার এবং প্রায় ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অবৈধ ঘুষ ও গোপন কমিশন বাণিজ্যের অন্ধকার তথ্য পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হয়। ওই বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের (ডিওজে) সরাসরি অনুরোধে সুইস পুলিশ জুরিখের এক বিলাসবহুল হোটেলে অতর্কিত অভিযান চালিয়ে ফিফার সাতজন জ্যেষ্ঠতম কর্মকর্তাকে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেপ্তার করে।

এই নজিরবিহীন ও আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারিই শেষ পর্যন্ত ধুলোয় মিশিয়ে দেয় তৎকালীন দীর্ঘমেয়াদী ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার এবং তার সম্ভাব্য সুযোগ্য উত্তরসূরি, উয়েফা প্রধান মিশেল প্লাতিনির সাজানো সাম্রাজ্য। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ফিফার নৈতিকতা বিষয়ক কমিটি এই দু দুজন প্রভাবশালী ফুটবল ব্যক্তিত্বকেই ফুটবল-সংশ্লিষ্ট সমস্ত আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় কার্যক্রম থেকে দীর্ঘ আট বছরের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এমন এক চরম অস্থির, অস্থিতিশীল ও আস্থার সংকটে নিমজ্জিত প্রেক্ষাপটেই ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক বিশেষ নির্বাচনের মাধ্যমে ফিফার নতুন ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। সেই অগ্নিপরীক্ষার নির্বাচনে তিনি বাহরাইনের শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল-খলিফাকে ১১৫-৮৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন। তখন তার মূল নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে অন্যতম ছিল—বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া, অনুন্নত ও ছোট সদস্য দেশগুলোর জন্য ফুটবল উন্নয়ন তহবিল ব্যাপক বৃদ্ধি করা এবং ব্ল্যাটার-পরবর্তী সময়ে ফিফার ধুলোবালি মাখা হারানো সুনাম যেকোনো মূল্যে পুনরুদ্ধার করা।

অথচ এই পরাক্রমশালী নেতার শৈশবটা কিন্তু এতটা মসৃণ ছিল না। শৈশবে অতি শীর্ণকায় ও দুর্বল চেহারার কারণে পরিবারের সবাই তাকে পরম আদরে ডাকত 'পিকোলো', যার ইতালীয় অর্থ হলো 'ছোট্টটি'। ১৯৭০ সালে সুইজারল্যান্ডের এক সাধারণ শহরে জন্ম নেওয়া ইনফ্যান্তিনো শৈশবে এতটাই গুরুতর ও মরণঘাতী রক্তশূন্যতা রোগে আক্রান্ত ছিলেন যে, পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল এবং তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার বেলগ্রেড শহর থেকে জরুরি ভিত্তিতে বিরল গ্রুপের রক্ত নিয়ে কোনোমতে তার প্রাণ বাঁচানো হয়েছিল। ইতালীয় সাধারণ অভিবাসী বাবা ভিঞ্চেনজো এবং মা মারিয়ার সন্তান হিসেবে তিনি সুইজারল্যান্ডের মাটিতে বড় হলেও, অন্তরে নিজেকে সবসময় একজন খাঁটি ইতালিয়ান বলেই ভাবতেন। তখন তাদের পারিবারিক আর্থিক অনটন ও সংগ্রাম ছিল চরম পর্যায়ের। তার বাবা জীবিকার তাগিদে সারারাত চলন্ত ট্রেনে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতেন, আর তার মা দিনযাপনের জন্য স্থানীয় রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সিগারেট বিক্রি করতেন।

ইতালীয় এক দরিদ্র অভিবাসী দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া ইনফ্যান্তিনোর মাথার চুল ছিল জন্মগতভাবেই কিছুটা লালচে। আর এই ভিন্নধর্মী চেহারার কারণে সুইজারল্যান্ডের স্থানীয় বর্ণবাদী অধিবাসীদের কাছ থেকে শৈশবে তাকে প্রায়শই চরম ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। সুইজারল্যান্ডের সেই সময়ের দেয়ালে দেয়ালে স্থানীয় উগ্রবাদীরা কলঙ্কিত ভাষায় লিখে রাখত, ‘কুকুর এবং ইতালীয় অভিবাসীদের ভেতরে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ’। ইনফ্যান্তিনো নিজেই এক সাক্ষাৎকারে আবেগঘন কণ্ঠে স্বীকার করেছেন যে, শৈশবে নিজের চোখে দেখা ও সহ্য করা সেই চরম সামাজিক বৈষম্য ও বর্ণবাদের দগদগে ক্ষতটিই পরবর্তীতে তাকে ফুটবল খেলাকে বিশ্বজুড়ে শান্তি, সমতা ও ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলার মূল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে তিনি সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত ফ্রিবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অত্যন্ত সুনামের সাথে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি বা আইন পাস করেন। বর্তমানে ৫৬ বছর বয়সী এই ইনফ্যান্তিনো এক সম্ভ্রান্ত লেবানিজ নারীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং তিনি ব্যক্তিগত জীবনে চার কন্যাসন্তানের জনক। তিনি নিজের অসামান্য মেধার জোরে আরবিসহ পৃথিবীর মোট ৭টি আন্তর্জাতিক ভাষায় অনর্গল ও সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন। একই সাথে তার ঝুলিতে রয়েছে সুইজারল্যান্ড, ইতালি এবং লেবাননের মতো তিনটি ভিন্ন দেশের অফিশিয়াল নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, মায়ামি এবং সুইজারল্যান্ডের জুরিখের আন্তর্জাতিক ফিফা অফিসগুলোর রাজকীয় দায়িত্ব সামলানো এই দক্ষ সংগঠক নিজেই হাসি মুখে স্বীকার করেন যে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে প্রায়শই একাধিক মহাদেশ ও টাইম জোন সফর করতে হয়, যার কারণে তার শরীরের নিজস্ব প্রাকৃতিক ঘড়ি বা জৈবিক ঘড়ি (বডি ক্লক) আসলে কোন দেশের টাইম জোনে চলছে, তা তিনি নিজেও অনেক সময় ঠাহর করতে পারেন না।

ইনফ্যান্তিনোর ঘোর সমালোচকদের দুনিয়ায় কোনো অভাব না থাকলেও, ফিফার অধীনে থাকা বর্তমান ২১১টি সদস্য দেশের একটি বিশাল অংশই তাকে ফুটবলের প্রকৃত ‘ত্রাতা’ বা রক্ষাকর্তা মনে করে। কারণ তার এই ১০ বছরের জাদুকরী শাসনামলে ফিফা থেকে সদস্য দেশগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত বার্ষিক অনুদান তহবিল আগের তুলনায় প্রায় আট গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রত্যক্ষ ফলে বিশ্ব ফুটবলের সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রায় ৫১০ কোটি মার্কিন ডলারের এক বিশাল ও ঐতিহাসিক বিনিয়োগ সম্পন্ন করেছে ইনফ্যান্তিনোর ফিফা।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চোখ কপালে ওঠার জোগাড় হবে; ২০১৬ সালে ফিফার সর্বমোট বার্ষিক আয় যেখানে ছিল মাত্র ৫০ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার, সেখানে মাত্র এক দশকের ব্যবধানে ২০编制৫ সালের সর্বশেষ আর্থিক হিসাবে তা জ্যামিতিক হারে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬৬ কোটি মার্কিন ডলারে। আর চলমান ২০২৬ সালের এই মেগা বিশ্বকাপে ৪৮ দলের বিশাল টুর্নামেন্ট থেকে ফিফা তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার আয়ের এক বিশাল ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। শুধু দেদারসে আয় বৃদ্ধিই নয়, বরং ফুটবল ফেডারেশনগুলোর অভ্যন্তরীণ অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতি চিরতরে বন্ধ করতে তিনি অত্যন্ত কড়া ও কঠোর প্রশাসনিক নিয়মকানুন চালু করেছেন। অনুদানের টাকার সঠিক হিসাব ও গরমিল ধরতে তিনি বিশ্বের প্রতিটি সদস্য দেশে নিয়মিত বিরতিতে আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশেষজ্ঞদের অডিট দল পাঠাচ্ছেন। ফিফার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তার কাজের প্রশংসা করে বলেন, ‘জিয়ান্নি মূলত কোনো সনাতনী ক্রীড়া কর্মকর্তার মতো নয়, বরং একটি বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক কোম্পানির আধুনিক সিইও-র মতো নিখুঁত কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী অ্যাটর্নি জেনারেল এবং এফবিআইয়ের সর্বোচ্চ পরিচালক যখন ব্যক্তিগতভাবে মায়ামিতে অবস্থিত তার ফিফা অফিসে এসে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন, তখনই স্পষ্ট বোঝা যায় গত এক দশকে ফিফা নামক সংস্থাটিকে তিনি পেশাদারিত্বের দিক থেকে কতটা আমূল বদলে দিয়েছেন।’

ইনফ্যান্তিনো অবশ্য নিজেকে আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন না, বরং তিনি নিজেকে ফিফার একজন দক্ষ ‘সেলসম্যান’ বা বাঘ মারার বিক্রেতা মনে করেন। ২০২৫ সালে আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি ও আন্তর্জাতিক প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোর জন্য তিনি স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওভাল অফিসের ডেস্কে গিয়ে টুর্নামেন্টের জমকালো ট্রফিটি সাজিয়ে রেখে এসেছিলেন। এমনকি কোনো ধরনের নিরপেক্ষতার তোয়াক্কা না করে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে নিউইয়র্কের অত্যন্ত বিতর্কিত ‘ট্রাম্প টাওয়ার’-এর ভেতরে ফিফার বিশাল করপোরেট অফিস ভাড়া নেওয়া প্রসঙ্গে তার এক ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, বিশ্বজুড়ে হেডলাইন বা গণমাধ্যমের মূল শিরোনাম হওয়াই ছিল তাদের আসল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য, কারণ নেতিবাচক বা ইতিবাচক যেকোনো শিরোনামই মূলত প্রচার ও ব্র্যান্ড ভ্যালু বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্বকিপের মূল পরিধি ৩২ দল থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ৪৮ দলে রূপান্তর করে এশিয়া ও আফ্রিকার ফুটবলকে বিশ্বায়ন করার একক কৃতিত্বের বড় অংশ তিনি পেতেই পারেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঝপথে এসে মাঠের নান্দনিক ফুটবলকে ছাপিয়ে এখন বিশ্ব মিডিয়ার আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন স্বয়ং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। স্বাগতিক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দলের একজন ফুটবলারের একটি স্পষ্ট লাল কার্ড সম্পূর্ণ বাতিল বা স্থগিত করা নিয়ে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নীতিবহির্ভূত হস্তক্ষেপ এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ইনফ্যান্তিনোর প্রদর্শন করা ‘নগ্ন রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব’ বিশ্ব ফুটবলের শতবর্ষের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও কলঙ্কিত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ অভিভাবক সংস্থা উয়েফা এবং বিশ্বের নামী ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, স্বাগতিক দেশের এমন অন্যায্য রাজনৈতিক চাপের কাছে কাপুরুষের মতো মাথা নত করে ফিফা সভাপতি ফুটবলের সততা, নিরপেক্ষতা ও ‘ফেয়ার-প্লে’র শত বছরের সব অলিখিত নিয়ম নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন।

তবে প্রচার ও লাইমলাইটে থাকার এই তীব্র ও অতিরিক্ত নেশা অনেক সময় এই ক্ষুরধার নেতাকে চরম আন্তর্জাতিক বিপাকেও ফেলেছে। ২০২৩ সালে ফুটবল সম্রাট পেলের শেষকৃত্যের মতো এক শোকাবহ অনুষ্ঠানে কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে সাবেক ফুটবলারদের সাথে হাস্যোজ্জ্বল মুখে সেলফি তুলে বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছিলেন তিনি। এখানেই শেষ নয়, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরী দেশ ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানদের জোরপূর্বক মঞ্চে ডেকে হ্যান্ডশেক বা করমর্দন করাতে গিয়ে এক চরম বিব্রতকর ও কৃত্রিম পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন তিনি, যা পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ‘উদ্ভট ও সস্তা তামাশা’ বলে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় উল্লেখ করেন। এছাড়া ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর একটি অফিশিয়াল বৈঠকে অংশ নিয়ে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার মূল প্রতীক ‘লাল টুপি’ মাথায় পরিধান করার কারণে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) কঠোর নিরপেক্ষতার নীতিমালা লঙ্ঘনের দায়ে তদন্তের মুখোমুখিও হতে হয়েছিল এই ফুটবল সম্রাটকে। ফলে ক্ষমতার চূড়ায় বসে থাকা জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোকে ফুটবল বিশ্ব একাধারে ত্রাতা নাকি ফুটবলের ধ্বংসকারী হিসেবে মনে রাখবে, তা সময়ই বলে দেবে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর