চলতি বৈশ্বিক ফুটবল মহাযজ্ঞের মহাকাব্যিক ফাইনাল ম্যাচটি পরিচালনার সংক্ষিপ্ত তালিকায় বেশ ভালোভাবেই টিকে আছেন ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞ রেফারি মাইকেল অলিভার। তবে ৪১ বছর বয়সী এই ইংলিশ রেফারির বিশ্বমঞ্চের ফাইনাল বাঁশি বাজানোর স্বপ্ন পূরণ হওয়া না হওয়া এখন সম্পূর্ণ ঝুলে আছে আর্জেন্টিনার ভাগ্যের ওপর। ল্যাটিন আমেরিকার পরাশক্তি আর্জেন্টিনা যদি শেষ পর্যন্ত ফাইনালে পা রাখতে পারে, তবে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক এক অলিখিত নিয়মের কারণে সেই মহা-ম্যাচে দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন তিনি। এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে প্রায় ৪৪ বছরের পুরোনো এক সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাস।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে যে, ১৯৮২ সালের ঐতিহাসিক ফকল্যান্ডস যুদ্ধের তিক্ত স্মৃতির কারণে আর্জেন্টিনা সংশ্লিষ্ট কোনো ম্যাচে ইংল্যান্ডের রেফারিদের দায়িত্ব না দেওয়ার একটি দীর্ঘকালীন নিরপেক্ষ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করে আসছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে—তা নিয়ে হওয়া সেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সময় আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন সামরিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই গভীর ক্ষতটি এখনো দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে টুর্নামেন্টের নিরপেক্ষতা শতভাগ বজায় রাখার স্বার্থে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলে মাইকেল অলিভারকে সেই ম্যাচের পরিচালনার গুরুদায়িত্ব দেওয়া হবে না। একইভাবে ইংল্যান্ডের কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচেও আর্জেন্টিনার রেফারিদের ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া থেকে বিরত থাকে ফিফা। এর আগে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও ঠিক একই অলিখিত নিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়ে ফাইনাল পরিচালনার দৌড় থেকে নাটকীয়ভাবে ছিটকে গিয়েছিলেন আরেক নামী ইংলিশ রেফারি অ্যান্থনি টেলর।
বর্তমান বিশ্বকাপে অলিভার ইতিমধ্যে দুর্দান্ত দক্ষতায় ছয়টি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। স্পেন ও বেলজিয়ামের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি পরিচালনার মধ্য দিয়ে তাঁর ম্যাচসংখ্যা দাঁড়াবে সাতে, যা কোনো ইংলিশ রেফারির জন্য বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ম্যাচ পরিচালনার এক অনন্য নজির।
এদিকে মাঠের রাজনীতির বাইরে মিশরের বিপক্ষে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পর আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমের এক বিশেষ উদযাপন এখন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জয়ের উল্লাসে মেতে ওঠার সময় আলবিসেলেস্তে ফুটবলারদের গাওয়া একটি গানে ‘মালভিনাস’ বা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সেই ঐতিহাসিক প্রসঙ্গটি উঠে আসে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বৈশ্বিক আসরে অবশ্য রেফারিংয়ের মান নিয়ে ইতিমধ্যে কম জলঘোলা হয়নি। বিশেষ করে মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের রোমাঞ্চকর জয়ের পর মাঠের রেফারিং নিয়ে নিজের তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মিশর দলের প্রধান কোচ হোসাম হাসান। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা মাঠের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার চেয়ে অনেক ভালো ফুটবল খেলেছি। কিন্তু ফুটবল দুনিয়া সব সময় সবার জন্য ন্যায্য আচরণ করে না। ফিফা মুখে বড় বড় “ফেয়ার প্লে”-এর বুলি আওড়ালেও, মাঠে আজ যা ঘটেছে তা কোনোভাবেই কাম্য বা ন্যায্য ছিল না।’ রেফারিং নিয়ে চলমান বিতর্কের তালিকায় আরও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনকে একটি ম্যাচে স্পষ্ট লাল কার্ড দেখানোর পরও রহস্যজনকভাবে শেষ ষোলোর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁকে খেলার অনুমতি দেওয়ার বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ফুটবল বিশ্লেষকদের মনে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে।