দেশজুড়ে অবিরত ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে দেশের কয়েকটি জেলায় ইতিমধ্যে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে গত তিন দিনে পার্বত্য অঞ্চলসহ কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন মানুষ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আজও নতুন করে সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে এখনই আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তাদের দেওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ভারি বৃষ্টিপাতের ধারা আরও কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। বৃষ্টির এই তীব্রতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র একটি জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে, যেখানে দেশের মোট চারটি বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বন্যার স্পষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশের বেশ কয়েকটি প্রধান নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে বান্দরবান ও কক্সবাজারের সাঙ্গু নদী ও সাতামুহুরি নদী লামা স্টেশন এবং মৌলভীবাজার স্টেশনে মনু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এর পাশাপাশি হবিগঞ্জের খোয়াই নদী, মৌলভীবাজারের ধলাই এবং সুনামগঞ্জের কুশিয়ারা নদীর পানিও এখন বিপৎসীমার ওপর রয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় চট্টগ্রাম বিভাগের নদীসমূহের পানি সমতল উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু এবং মাভামুহুরী নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। অপরদিকে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার গোমতী, মুহরী, ফেনী, সেলোনিয়া এবং হালদা নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে কিছু কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যার ফলে এসব অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এর বাইরে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলোও সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
একইভাবে দেশের সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, ধলাই ও খোয়াই নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল থাকতে পারে, যার ফলে নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকবে। তবে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, আগামী তিন দিন সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কোথাও কোথাও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলেও বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যেখানে রংপুর বিভাগের ধরলা ও দুধকুমার নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তিস্তা নদীর পানি সমতল বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার তিস্তা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এছাড়া আগামী ৭২ ঘণ্টায় লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার ধরলা ও দুধকুমার নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে।
বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী দুই দিন সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। ভারতের উত্তর পশ্চিম মধ্য প্রদেশ ও আশপাশের এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় প্রবল মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত কক্সবাজার, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় আবহাওয়া অধিদপ্তর এই পাঁচ জেলায় পাহাড়ধসের বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে।