নিজস্ব প্রতিবেদক
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের পূর্বাঞ্চল ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে উপদ্রুত এলাকার মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে নজিরবিহীন ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে বন্যাকবলিত সুনির্দিষ্ট ১১টি জেলার সাধারণ মানুষ যাতে কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসাবঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের সমস্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। বানের পানিতে ডুবে যাওয়া বা দুর্গম হয়ে পড়া অঞ্চলে ডায়রিয়া, কলেরা ও সাপে কাটার মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, ওরস্যালাইন, আইভি স্যালাইন এবং বিষধর সাপের কামড়ের প্রতিষেধক বা অ্যান্টিভেনম মজুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন দেখা দিলে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে উপদ্রুত এলাকায় দ্রুত অতিরিক্ত বিশেষ মেডিকেল টিম পাঠানোর প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছে। আজ সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ে অবস্থিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মূল সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক জরুরি ও জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সরকারের এই দৃঢ় অবস্থানের কথা গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, গত কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিপাত ও সীমান্ত পেরিয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে চট্টগ্রাম ও সংলগ্ন অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই চরম প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখতে সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একটি উপদ্রুত এলাকার হাসপাতালের নিচতলায় বানের পানি প্রবেশ করার পরও সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাতের অন্ধকারেই সমস্ত মূল্যবান চিকিৎসাসরঞ্জাম ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ নিরাপদ ও শুষ্ক স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন এবং রোগীদের সেবা দিয়ে গেছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ মোট ১১টি জেলাকে তীব্র বন্যাকবলিত অঞ্চল হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই জেলাগুলোর সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থা তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একজন করে জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসককে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে মাঠে পাঠানো হয়েছে। একই সাথে মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পুরো পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বন্যায় আটকে পড়া গর্ভবতী নারী, নবজাতক শিশু ও দুর্গম চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের দোরগোড়ায় যেন প্রাথমিক চিকিৎসা পৌঁছায়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সিভিল সার্জনদের কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বন্যার সময় গ্রামীণ ও উপদ্রুত অঞ্চলে সাপের উপদ্রব এবং সাপে কাটার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশবাসীকে ওঝা বা কবিরাজের কাছে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট না করে আক্রান্ত রোগীকে সরাসরি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য বিনীত ও জোর আহ্বান জানান। তিনি জানান, বন্যার প্রথম রাতেই বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে পাঁচজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, যাদের প্রত্যেককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করার ফলে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। এ প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী হালনাগাদ পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, এ পর্যন্ত বন্যাকবলিত অঞ্চলের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৯৫ জন সাপে কাটা রোগী সফলভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। বর্তমানে জেলা পর্যায়ে ২১ হাজার ভায়াল এবং কেন্দ্রীয়ভাবে আরও এক হাজারের বেশি ভায়াল অ্যান্টিভেনম সম্পূর্ণ সুরক্ষিত অবস্থায় মজুত রয়েছে। এ ছাড়া আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আরও ২৫ হাজার ভায়াল জরুরি প্রতিষেধক সরকারের চিকিৎসা ভাণ্ডারে যুক্ত হতে যাচ্ছে, ফলে কোনো ধরনের অ্যান্টিভেনম সংকটের বিন্দুমাত্র আশঙ্কা নেই।
স্বাস্থ্য সচিব আরও যোগ করেন যে, বন্যাপরবর্তী সময়ে সাধারণত পানিবাহিত রোগ ও ডায়রিয়ার প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করে। তা প্রতিরোধ করতে উপদ্রুত এলাকায় লাখ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বা হ্যালোজেন ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি সফলভাবে মোকাবিলা করতে পর্যাপ্ত ওআরএস ও স্যালাইন মজুত রাখার পাশাপাশি বিশেষায়িত মেডিকেল টিমগুলোকে সবসময় সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। কোনো রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে তাকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভাগীয় হাসপাতালে স্থানান্তরের বিশেষ সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাও প্রস্তুত রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই যাতে চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে পারেন, সে জন্য জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কল সেন্টার ১৬২৬৩ নম্বর এবং অফিশিয়াল স্বাস্থ্য বাতায়ন ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা হয়েছে। বানের পানির পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের বর্তমান গ্রাফও কেন্দ্রীয়ভাবে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য একটাই— এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যেন দেশের একটি মানুষও সঠিক চিকিৎসার অভাবে কিংবা ওষুধের সংকটে অকালে প্রাণ না হারান। এই বিশাল ও মানবিক দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবিলা করতে তিনি দেশের সকল সচেতন গণমাধ্যমের আন্তরিক সহযোগিতা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন কামনা করেন।
আকাশজমিন/ আরআর