আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের সামগ্রিক সুশাসন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে মেধা, সততা ও নিষ্ঠার মতো মৌলিক আদর্শগুলো আজ চরমভাবে নির্বাসিত। রাষ্ট্রীয় সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন নিয়মানুবর্তিতা কিংবা দেশপ্রেমের চেয়ে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে অর্জিত বিপুল অর্থ-বিত্ত ও বৈভবকে এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী "সম্মানের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি" হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। এই নৈতিক অবক্ষয়ের সবশেষ নজির হিসেবে সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একজন প্রভাবশালী প্রকৌশলী খায়রুল বাকের এর বিরুদ্ধে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সম্পূর্ণ অবৈধ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের এক সুনির্দিষ্ট ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ বিভিন্ন মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে আসা এই গুরুতর অভিযোগে বলা হয়েছে যে, খায়রুল বাকেরের নামে-বেনামে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ১৩টি বিলাসবহুল বাড়ি সহ বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পাহাড় গড়ে উঠেছে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ও উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন গুরুতর ও সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর যেখানে সংশ্লিষ্ট সংস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও বিভাগীয় তদন্ত শুরু হওয়ার কথা ছিল, তা না হয়ে উল্টো এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকার ক্ষমতার জোরেই তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান এবং সমাজে একজন অত্যন্ত "প্রভাবশালী" ও "বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তি" হিসেবে বুক ফুলিয়ে দাপটের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অপরাধের আইনি বিচার হওয়ার পরিবর্তে কালো টাকার দাপটে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতির এই অন্ধকার জগতকে এক ধরণের সামাজিক সম্মানের মোড়কে চমৎকারভাবে আড়াল করা হচ্ছে।
একই সাথে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন মেধা ও সিনিয়রিটির ভিত্তিতে পদোন্নতির স্বাভাবিক ও আইনানুগ ব্যবস্থার পরিবর্তে এক ধরণের অন্ধ "ভক্ত" তৈরি ও প্রশ্নবিদ্ধ আনুগত্যের অপসংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নীতি-নির্ধারণী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সম্প্রতি ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল বারি এর নাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রশাসনিক অভিযোগ উঠেছে যে, যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র উপরস্থ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে খুশি করা, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব খাটিয়ে বিশেষ সুপারিশ আদায় এবং পর্দার অন্তরালে বিপুল অঙ্কের অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতি নিশ্চিত করার এক মারাত্মক আত্মঘাতী প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল বারি যার পাহাড়সম দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কে স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত অবগত আছেন, তারপরও তাকে সমস্ত আইন ও নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই শীর্ষ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। যারা এই অনিয়ম ও দুর্নীতির চক্র বা "সিস্টেম" সম্পূর্ণ নিজেদের আয়ত্তে রাখতে পারেন, তারাই আজ প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে পদোন্নতি পেয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে অত্যন্ত "সম্মানিত" ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে নিজেদের জাহির করতে সক্ষম হচ্ছেন।
সরকারি খাতের এই ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী অপসংস্কৃতির কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় তিনটি বড় এবং অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।
প্রথমত, আমলাতন্ত্রে জবাবদিহিতার চরম অভাব দেখা দিচ্ছে; দুর্নীতির মাধ্যমে এক একজন কর্মকর্তা বিপুল অর্থের মালিক ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা যেকোনো নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়াকে তারা অত্যন্ত সুকৌশলে ক্ষমতার জোরে বাধাগ্রস্ত বা চিরতরে ধামাচাপা দিতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, এই সংস্কৃতি রাষ্ট্রের নতুন প্রজন্মের ও নবীন কর্মকর্তাদের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক ও একটি মারাত্মক ভুল বার্তা দিচ্ছে; নতুন চাকুরিতে যোগ দেওয়া কর্মকর্তারা খুব সহজেই বুঝতে পারছেন যে কর্মজীবনে সততা বা দক্ষতা নয়, বরং অবৈধ টাকা এবং ওপর মহলে তেলবাজিই হলো সফলতার একমাত্র চাবি।
তৃতীয়ত, এর ফলে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত জনসেবার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকছে; জনগণের অর্থে পরিচালিত মেগা প্রকল্পগুলোতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় জ্যামিতিক হারে বাড়লেও সেবার মান ও কাজের স্থায়িত্ব চরমভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যার সরাসরি ভুক্তভোগী হচ্ছে দেশের সাধারণ জনগণ।
এই চরম সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং সুশাসন নিশ্চিতকল্পে রাষ্ট্রকে এখনই চার দফা কঠোর ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, যেকোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি সকল উচ্চপদস্থ ও নীতিনির্ধারক কর্মকর্তাদের বার্ষিক সম্পদের সঠিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং তা স্বাধীন অডিট প্যানেল দ্বারা যাচাই করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
তৃতীয়ত, পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ বা সুপারিশের তোয়াক্কা না করে কঠোর লিখিত পরীক্ষা, বার্ষিক কর্মমূল্যায়ন এবং একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের নির্বাচন কমিটির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, "টাকা ও ক্ষমতা থাকলেই সমাজে সে সম্মানিত ব্যক্তি" - এই প্রাচীন ও ভ্রান্ত সামাজিক মূল্যবোধের বলয় থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে এবং সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমকে প্রকৃত সম্মানের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
উল্লেখ্য, যতদিন পর্যন্ত এ দেশের বড় বড় দুর্নীতিবাজ ও অর্থ পাচারকারীরা নিজেদের "সম্মানের মোড়কে" আড়াল করে সমাজে দাপট দেখাবে, ততদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়ন সম্পূর্ণ বাধাগ্রস্ত হবে। তাই রাষ্ট্র ও সমাজকে আজই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে— আমরা ভবিষ্যতে কাদের প্রকৃত সম্মান দেব? অবৈধ উপায়ে সম্পদের পাহাড় গড়া এই খায়রুল বাকের বা রেজাউল বারির মতো ব্যক্তিদের, নাকি দিনরাত সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করা একজন নিষ্ঠাবান ও সৎ জনসেবককে?
আকাশজমিন / আরআর