বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলমান থাকায় যেমন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তেমনি এবার প্রশ্নপত্রের মান নিয়েও দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নে ভুল, কিছু বিষয়ে তুলনামূলক কঠিন প্রশ্ন এবং পরীক্ষা পরিচালনা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর প্রশ্ন উঠেছে—এত ধাপের গোপনীয়তা, যাচাই-বাছাই ও মডারেশনের পরও পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল কীভাবে থেকে যায়?
এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে ২ জুলাই। এতে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। দেশের ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে অতিবৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং ওই অঞ্চলের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের একাধিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। সর্বশেষ ১৬ জুলাই পর্যন্ত ওই বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পরীক্ষা চলমান থাকলেও প্রবল বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন জেলায় পরীক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। কোথাও হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানি মাড়িয়ে, আবার কোথাও নৌকায় চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভও করেছেন।
পরীক্ষা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় আসে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্ন। জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন স্বীকার করেন, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ত্রুটি ছিল। এজন্য ওই দুটি প্রশ্নে সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রশ্নপত্রের মডারেশনের দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন।
নোটিশ পাওয়া চার শিক্ষক হলেন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, বৃন্দাবন সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক কাজী জুনায়েদ আল আমিন, এমসি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোছাদ্দেক হোসেন খান এবং সিলেট সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
পরীক্ষার্থীদের একটি অংশের অভিযোগ, শুধু প্রশ্নের ভুলই নয়, এবার বাংলা, পদার্থবিজ্ঞানসহ কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন হয়েছে। অনেক অভিভাবকও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাদের মতে, করোনা মহামারির পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হয়নি। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন কিছুটা সহজ হওয়া উচিত ছিল।
তবে শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, প্রশ্ন সিলেবাসের বাইরে থেকে করা হয়নি। তাদের মতে, অনেক শিক্ষার্থী মূল পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে গাইড বইয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় প্রশ্ন কঠিন মনে হতে পারে। অথচ প্রশ্ন তৈরি করা হয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই অনুসরণ করেই।
যেভাবে তৈরি হয় প্রশ্নপত্র
বর্তমানে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি বিষয়ে বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) ও সৃজনশীল—দুই অংশের জন্য পৃথক প্রশ্ন প্রস্তুত করা হয়।
প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে প্রধান প্রশিক্ষকদের (মাস্টার ট্রেইনার) একটি তালিকা থাকে। সেই তালিকা থেকে নির্ধারিত সময়ের আগে প্রতিটি বিষয়ে চারজন প্রশ্নপ্রণেতা নির্বাচন করা হয়। প্রত্যেকে আলাদাভাবে একটি করে পূর্ণাঙ্গ প্রশ্নপত্র তৈরি করেন এবং সিলগালা খামে তা বোর্ডে জমা দেন।
এরপর শুরু হয় মডারেশন বা পরিশোধন প্রক্রিয়া। চারজন অভিজ্ঞ শিক্ষক গোপনীয়তার সঙ্গে প্রশ্নগুলো যাচাই করেন। তারা প্রয়োজনে প্রশ্ন সংশোধন, সংযোজন, বর্জন কিংবা সম্পূর্ণ নতুন প্রশ্নপত্র তৈরিরও ক্ষমতা রাখেন।
যাচাই শেষ হলে চার সেট প্রশ্ন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া হয় এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় সংরক্ষণ করা হয়।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবস্থায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের জন্য মোট ৩৬ সেট প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করা হয়। এরপর বোর্ডের চেয়ারম্যানরা লটারির মাধ্যমে চার সেট নির্বাচন করেন। এর মধ্যে দুটি সেট বিজি প্রেসে ছাপানোর জন্য পাঠানো হয় এবং বাকি দুটি সংরক্ষণে রাখা হয়, যাতে প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়।
প্রশ্নপত্র ছাপা শেষ হলে সেগুলো স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। জেলা পর্যায়ে সাধারণ ট্রেজারি এবং উপজেলা পর্যায়ে সাধারণত থানায় প্রশ্নপত্র নিরাপত্তার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরীক্ষার দিন সকাল ৯টা ১০ মিনিটে আন্তশিক্ষা বোর্ডের সভাপতি লটারির মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রশ্নপত্র নির্বাচন করেন। এরপর সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং জেলা প্রশাসনকে তা জানানো হয়। ফলে আগে থেকেই কোন প্রশ্নপত্র ব্যবহার হবে, তা জানার সুযোগ থাকে না। এ কারণেই প্রশ্নে কোনো ভুল থাকলেও পরীক্ষা শুরুর আগে সেটি শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
শিক্ষা বোর্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে, এবার পদার্থবিজ্ঞানের যে প্রশ্নপত্রে ত্রুটি ধরা পড়েছে, সেটি সিলেট শিক্ষা বোর্ডে প্রস্তুত করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমানের মতে, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরির জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় প্রশ্নের মান ও স্তর নির্ধারণে অসঙ্গতি থেকে যায়। বিশেষ করে সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনেক প্রশ্নপ্রণেতা নির্ধারিত মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করতে পারেন না।
তার মতে, প্রশ্নপ্রণয়ন ও মডারেশন—উভয় পর্যায়েই আরও দক্ষ, প্রশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ শিক্ষককে যুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষা বোর্ডগুলোর উচিত প্রশ্নপ্রণেতা ও মডারেটরদের দক্ষতা নিয়মিত মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও মানোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া। তাহলেই ভবিষ্যতে এমন ভুলের পুনরাবৃত্তি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।