ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

২২ লক্ষ আমলার তদারকিতে মাত্র ২ হাজার কর্মী: ঠুঁটো জগন্নাথ দুদক?


  • আপলোড সময় : বুধবার ১৫ জুলাই, ২০২৬ সময় : ১:৩০ পিএম

মোঃ আব্দুল কাইয়ুম খান,বিশেষ প্রতিনিধি

বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি এখন আর কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং সময়ের এক অপরিহার্য দাবি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বর্তমান প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সরকারি ব্যয়ের লাগাম টানা, প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় নাগরিক সেবাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পৌঁছে দেওয়া।

কিন্তু প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত দুর্নীতি নামক ব্যাধিটি যদি সমূলে উৎপাটন করা না যায়, তবে এই দূরদর্শী ও কল্যাণমুখী সব উদ্যোগই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির প্রধান অন্তরায় এবং জাতীয় উন্নয়নের চিরশত্রু হলো এই দুর্নীতি।

একদিকে যেমন সরকারের মাননীয় মন্ত্রীবৃন্দ ও বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় সংসদ সদস্যগণ নানাবিধ সরকারি দপ্তর ও চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সশরীরে পরিদর্শন করছেন, কাজের গুণগত মান কঠোরভাবে যাচাই করছেন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে নজিরবিহীন নজরদারি চালাচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের প্রধান বিরোধী দলও সংসদ ও সংসদের বাইরে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে প্রতিনিয়ত জবাবদিহিতার আওতায় আনার একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সামগ্রিক এই রাজনৈতিক ও সামাজিক সদিচ্ছার কল্যাণে দেশ দৃশ্যত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে রাষ্ট্রের এই অগ্রযাত্রার গতিকে ভেতরে ভেতরে স্তিমিত করে দিচ্ছে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধে থাকা দুর্নীতি। এই কাঠামোগত অনিয়ম ও অনৈতিকতার লাগাম যদি এখনই টেনে ধরা না যায়, তবে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত মেগা প্রকল্পগুলোর প্রকৃত সুফল সাধারণ জনগণের কোনো কাজেই আসবে না।

১. প্রশাসনিক জনবল ও দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বাস্তব চিত্র

একটি রাষ্ট্রের বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য যে প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন, বাংলাদেশে তা দিন দিন প্রসারিত হয়েছে। সরকারি খতিয়ান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২২ লক্ষ। শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, জাতীয় রাজস্ব অহরণ, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং মেগা অবকাঠামো উন্নয়নসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি মৌলিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ কাজের চালিকাশক্তি হলেন এই বিশাল সংখ্যক জনবল। তবে এই বিশাল প্রশাসনিক বাহিনীকে কার্যকর তদারকি, নিয়মতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং আর্থিক স্বচ্ছতার আওতায় আনার জন্য যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি এককভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর সাংগঠনিক অবস্থা চরম জনবল সংকটে জর্জরিত।

নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশনে বর্তমানে প্রেষণ ও স্থায়ী কাঠামো মিলিয়ে মাত্র ২,১৪৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এই গাণিতিক হিসাবটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি সমীকরণ তৈরি করে। হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রতি দশ হাজার ৪০ জন সরকারি কর্মচারীর কর্মকাণ্ড ও সততা নজরদারির জন্য দুদকের মাত্র একজন কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। এই চরম ও অস্বাভাবিক অনুপাতের কারণে দুদকের পক্ষে দেশব্যাপী বিস্তৃত কোনো প্রতিরোধমূলক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা অনুসন্ধান করা, বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তার বার্ষিক সম্পদের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করা এবং বিচারাধীন দুর্নীতি মামলার আইনি লড়াই সফলভাবে পরিচালনা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে দুর্নীতিবাজরা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি উপভোগ করছে, যা সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে।

এই সাংগঠনিক দুর্বলতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়ায়। প্রথমত, সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ শতশত অভিযোগ জমা হলেও জনবল সংকটের কারণে তদন্ত শেষ করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাচ্ছে, যা অপরাধীদের আলামত নষ্ট করার সুযোগ করে দেয়। দ্বিতীয়ত, অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ বা প্রাথমিক তদন্ত চলমান থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতির সুযোগে তারা নিয়মিত পদোন্নতি পেয়ে যাচ্ছেন এবং নীতিনির্ধারণী পদে আসীন হচ্ছেন। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, এর ফলে সৎ, দেশপ্রেমিক ও যোগ্য কর্মকর্তারা field level-এ চরমভাবে নিরুৎসাহিত ও কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন, আর অন্যদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেটগুলো দিন দিন আরও বেপারোয়া ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।

২. দুর্নীতির প্রধান উৎসস্থল এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্বের অপচয়

দুর্নীতির করাল গ্রাসে রাষ্ট্র প্রতিবছর তার ন্যায্য রাজস্ব আয়ের এক বিশাল অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মূলত তিনটি প্রধান খাত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো দেশের কাস্টমস ও বন্দর ব্যবস্থাপনা। আমদানি এবং রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা দেওয়া, পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া (যাকে আন্তর্জাতিক পরিভাষায় আন্ডার-ইনভয়েসিং বলা হয়) এবং বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত খালাসের নামে অবৈধ লেনদেন ও নানা অনিয়মের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে রাষ্ট্র।
Queue-তে থাকা দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ণ খাতটি হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতাধীন আয়কর বিভাগ। দেশের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং উচ্চ আয়ের এক শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ তাদের প্রকৃত বার্ষিক আয় গোপন করে বছরের পর বছর ধরে ভুয়া ও মিথ্যা রিটার্ন দাখিল করে আসছেন। এই পদ্ধতিগত কর ফাঁকির সংস্কৃতি সমাজ ও অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, এর ফলে রাষ্ট্রের কোষাগারে যে অর্থ জমা হওয়ার কথা ছিল, তার সিংহভাগই অন্ধকার অর্থনীতিতে চলে যাচ্ছে। তৃতীয় খাতটি হলো সাধারণ মানুষের সরাসরি সম্পৃক্ততার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসমূহ। ভূমি বা জমি কেনাবেচা এবং তা নিবন্ধনের সময় সরকারি ফি ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে দলিলে জমির প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্য প্রদর্শন করা হয়। এর পাশাপাশি ঘুষের বিনিময়ে দ্রুত কাজ সম্পাদন এবং জালিয়াতির মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তনের সংস্কৃতি এখানে একটি নিত্যদিনের সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তিনটি প্রধান খাত থেকে পদ্ধতিগত ফাঁকি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি যদি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়, তবে কেবল এই খাতগুলো থেকেই প্রতিবছর যে অতিরিক্ত রাজস্ব সংগৃহীত হবে, তা দেশের একটি পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক জাতীয় বাজেটের সমপরিমাণ দাঁড়াবে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যদি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা নিশ্চিত করা যায়, তবে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা সম্পূর্ণ হ্রাস পাবে। একই সাথে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন, কৃষি খাতে বৈপ্লবিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে আরও অনেক বড় পরিসরে মেগা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

৩. দুর্নীতি দমনে ৫ দফা কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাবনা

দুর্নীতি দমন কমিশনকে নখদন্তহীন বাঘের অপবাদ থেকে মুক্ত করে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, শক্তিশালী, আধুনিক এবং জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিম্নলিখিত ৫ দফা কৌশলগত ও কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি:

দফা-১: জনবল কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর আমূল সম্প্রসারণ: দুদকের বর্তমান লোকবল কাঠামো ভেঙে একে পর্যায়ক্রমে কমপক্ষে ২০ হাজার দক্ষ কর্মীবাহিনীতে উন্নীত করতে হবে। কমিশনের কার্যক্রমকে শুধুমাত্র রাজধানী বা বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক না রেখে দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি করে স্থায়ী প্রশাসনিক অফিস এবং আধুনিক অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। এর ফলে গ্রামীণ ও তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষ কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি তাদের অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন এবং স্থানীয় পর্যায়ের ছোট-বড় দুর্নীতি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

দফা-২: আধুনিক ডিজিটাল তদন্ত ব্যবস্থা ও লজিস্টিকস নিশ্চিতকরণ: দুদকের প্রতিটি জেলা ও আঞ্চলিক অফিসে পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট হিসেবে আধুনিক যানবাহন, আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি, সুসজ্জিত সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল এবং বিগ ডাটা অ্যানালাইসিস টিম গঠন করতে হবে। সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, দেশ-বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য এবং সরকারি প্রকল্পের ফাইলের গতিপ্রকৃতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুত যাচাই করার জন্য কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।

দফা-৩: বিশেষায়িত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন: দুর্নীতির মামলা বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখার সংস্কৃতি বন্ধ করতে দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে ডেডিকেটেড ‘দুর্নীতি দমন বিশেষ জজ আদালত’ বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। প্রচলিত ফৌজদারি আইন সংশোধন করে এটি বাধ্যতামূলক করতে হবে যেন যেকোনো দুর্নীতির মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি হয়। দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা এবং দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই কেবল দুর্নীতিবাজদের মনে আইনের প্রতি ভীতি তৈরি হবে।

দফা-৪: শতভাগ সম্পদের হিসাব প্রকাশ ও কঠোর স্ক্রুটিনি: রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের গ্রেড-১ থেকে শুরু করে গ্রেড-২০ পর্যন্ত কর্মরত সকল স্তরের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিজের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বার্ষিক স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের সঠিক হিসাব একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টালে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতি বছর লটারির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে (র্যান্ডম সিলেকশন) অন্তত ১০ শতাংশ কর্মকর্তার সম্পদের হিসাব মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে স্ক্রুটিনি বা যাচাই করবে। আয়ের উৎসের সাথে সম্পদের কোনো ধরনের অসঙ্গতি বা অবৈধ সংশ্লেষ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে আদালতের মাধ্যমে সেই অবৈধ সম্পদ পুরোপুরি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করতে হবে।

দফা-৫: নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের কার্যকর অংশগ্রহণ: দুর্নীতি বিরোধী লড়াইকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে দুদকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একটি শক্তিশালী ‘সিভিল সোসাইটি মনিটরিং সেল’ বা নাগরিক সমাজ পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করতে হবে। দেশের বিভিন্ন দুর্নীতি বিরোধী বেসরকারি সংগঠন, অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং সচেতন সাধারণ নাগরিকদের প্রাপ্ত গোপন তথ্য সরাসরি দুদকের নীতি-নির্ধারকদের কাছে নিরাপদে পৌঁছানোর জন্য একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ও আধুনিক এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল চ্যানেল তৈরি করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় তথ্য প্রদানকারী বা হুইসেলব্লোয়ারদের রাষ্ট্রীয় ও আইনি নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে।

৪. অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা: সক্ষমতা বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বনাম রিটার্ন

সাধারণ আমলাতান্ত্রিক ও প্রচলিত দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকেই মনে করতে পারেন যে, দুর্নীতি দমন কমিশনের জনবল বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং নতুন অফিস স্থাপনের জন্য সরকারের বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো মানে কেবলই রাষ্ট্রের অনুৎপাদনশীল ব্যয় বৃদ্ধি করা। কিন্তু গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্যায়ন এবং আধুনিক ফিন্যান্সিয়াল মডেলিংয়ের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুদকের সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে অর্থ ব্যয় করা আসলে কোনো খরচ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে লাভজনক ও উচ্চ রিটার্ন সমৃদ্ধ একটি বিনিয়োগ।

যদি সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনের সামগ্রিক সংস্কার, দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত লজিস্টিকস নিশ্চিত করার জন্য বার্ষিক বাজেটে অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করে, তবে তার বিপরীতে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও সুনির্দিষ্ট খাতের রাজস্ব ফাঁকি রোধ করার মাধ্যমেই সরকারের জাতীয় আয় কয়েক লক্ষ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাবে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আসা এই বিশাল অর্থ দিয়ে দেশের অবহেলিত অঞ্চলে অন্তত ১০টি আধুনিক মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল, ৫০০টি আন্তর্জাতিক মানের মডেল স্কুল অথবা হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ উন্নত চার লেনের মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ করা অনায়াসেই সম্ভব। অতএব, দুদককে শক্তিশালী করার পেছনে রাষ্ট্রীয় অর্থ বরাদ্দ কোনো অপচয় বা বিলাসিতা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্র বিনির্মাণের অন্যতম সেরা সঞ্চয় মাধ্যম।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির যে রূপকল্প ও স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রযন্ত্র ও সাধারণ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। সরকারের বার্ষিক ব্যয় সংকোচন, মেগা প্রজেক্টগুলোর সফল ও সময়োপযোগী বাস্তবায়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মানসম্মত নাগরিক সেবা পৌঁছানো — এর প্রতিটি সূচকের সাফল্যই নির্ভর করছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, স্বাধীন এবং প্রভাবমুক্ত দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার ওপর।


আজকের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আমরা যদি দুর্নীতি দমন কমিশনকে আমূল সংস্কার করে ঢেলে সাজাতে ব্যর্থ হই, তবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আগামী প্রজন্ম আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে সরকারের ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার এই মহতী নীতিকে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করি। রাষ্ট্র, সরকার, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সচেতন জনগণের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ একদিন দুর্নীতিমুক্ত, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন এক অদম্য সোনার বাংলায় পরিণত



এ সম্পর্কিত আরো খবর