মোঃ বাকি অনীক, কুমিল্লা প্রতিনিধি
ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী জেলা কুমিল্লা বর্তমানে এক আধুনিক ও ব্যস্ততম নগরীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষ ও শত শত যানবাহন এই নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলো দিয়ে চলাচল করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর আধুনিকায়ন ও নান্দনিক রূপকে চরমভাবে মলিন করে দিচ্ছে যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ বিলবোর্ড, ব্যানার ও বাণিজ্যিক স্টিকারের দাপট। বিশেষ করে নগরীর প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত পুলিশ লাইন চৌরাস্তা, কান্দিরপাড়, রাজগঞ্জ, শাসনগাছা, টমছমব্রিজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের ডিভাইডার ও ল্যাম্পপোস্টগুলোতে ঝুলতে থাকা এসব বিলবোর্ড এখন পথচারী ও চালকদের জন্য এক মহা আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কুমিল্লা মহানগরের ২৭টি ওয়ার্ডের প্রায় সব কটি এলাকাতেই ছড়িয়ে রয়েছে এই বিলবোর্ডগুলো। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে বারবার এসব অবৈধ ব্যানার-বিলবোর্ড উচ্ছেদ করার পরও অদৃশ্য প্রভাবে আবার এগুলো লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আইনকে তোয়াক্কা না করে নিষিদ্ধ স্থানে এবং বিপজ্জনকভাবে রাস্তার মাঝখানে এসব বিলবোর্ড স্থাপন যেন এক নিত্যদিনের নিয়মে পরিণত হয়েছে।
রাস্তার ঠিক মাঝখানে বা আইল্যান্ডে অবস্থিত ল্যাম্পপোস্টে যখন বড় বড় বিলবোর্ড ঝোলানো হয়, তখন তা গাড়ির চালকদের দৃষ্টিসীমায় প্রচণ্ড বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে মোড় ঘোরার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন দেখতে না পেয়ে প্রায়শই ঘটছে ছোট-বড় নানা ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা। অনেক সময় ঝোড়ো হাওয়া বা সামান্য বৃষ্টিতে এসব দুর্বলভাবে টাঙানো বিলবোর্ড পথচারী কিংবা চলন্ত যানবাহনের ওপর ভেঙে পড়ার চরম ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও পরিচ্ছন্ন সড়কের যে নান্দনিক সৌন্দর্য ছিল, তা এসব কদর্য ও আইনবহির্ভূত ব্যানারের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে।
কেবল বিলবোর্ডই নয়, ল্যাম্পপোস্টগুলোতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রচারণামূলক অবৈধ স্টিকারও সাঁটানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত, যা সৌন্দর্যহানির পাশাপাশি নগর পরিবেশ নষ্ট করছে।
কোচিং সেন্টার, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শুভেচ্ছা বার্তা কিংবা ব্যক্তিগত প্রচারণার কাজে ব্যবহৃত এসব রঙ-বেরঙের স্টিকার ও বিলবোর্ড ল্যাম্পপোস্টগুলোর সৌন্দর্য সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিচ্ছে। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যখন অনেক কষ্টে সড়ক পরিষ্কার বা ল্যাম্পপোস্টগুলো রঙ করে সুন্দর রাখার চেষ্টা করেন, তার পরপরই একশ্রেণীর অসচেতন ও দায়িত্বহীন মানুষ রাতের আঁধারে কিংবা সুযোগ বুঝে আবার নতুন করে সেখানে স্টিকার ও ব্যানার সাঁটিয়ে দিয়ে যায়। এর ফলে নগর কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদ অভিযানের সার্বিক খরচ ও পরিশ্রম ভেস্তে যাচ্ছে, অন্যদিকে নগরী হারাচ্ছে তার কাঙ্ক্ষিত নান্দনিক রূপ।
আইনবহির্ভূত এসব কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কুমিল্লা নগরবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাতায়াতকারী নাগরিকদের মতে, কেবল লোকদেখানো বা সাময়িক উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যারা আইন অমান্য করে বারবার অবৈধ বিলবোর্ড ও স্টিকার লাগাচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে মোটা অঙ্কের জরিমানা এবং কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে ল্যাম্পপোস্ট ও সরকারি স্থাপনায় অবৈধভাবে বিজ্ঞাপনদাতাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ একটি আধুনিক, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে হলে যত্রতত্র বিলবোর্ড টাঙানোর এই অপসংস্কৃতি এখনই বন্ধ করতে হবে।
সচেতন নগরবাসীর সুস্পষ্ট দাবি, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এবং জেলা ট্রাফিক পুলিশ যৌথভাবে অবিলম্বে একটি স্থায়ী তদারকি সেল গঠন করুক। যদি নির্দিষ্ট স্থানে বা অনুমোদিত উপায়ে ছাড়া অন্য কোথাও এমন অবৈধ প্রচারপত্র সাঁটানো হয়, তবে তার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। তবেই কুমিল্লা নগরী তার হারিয়ে যাওয়া রূপ ফিরে পাবে এবং নগরবাসী পাবে একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও যানজটমুক্ত সুন্দর শহর।