হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে চরম অনিয়ম ও অর্থ হরিলুটের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। প্রকল্পের শোভাবর্ধনের জন্য রোপণ করা সাধারণ চারা গাছের অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ থেকে শুরু করে বিদ্যমান পুকুর নতুন করে সংস্কারের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিল পরিশোধ করার মাধ্যমে এই পুকুরচুরি সংঘটিত হয়েছে। বাংলাদেশ মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) এক বিশেষ অডিট রিপোর্টে উঠে এসেছে, কোনো প্রকার নিয়মকানুন ও কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়াই অন্তত ৬০০টি খাতে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পাশাপাশি সব মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত পরিশোধ ও গুরুতর অনিয়ম করা হয়েছে।
প্রকল্পের নথি ও প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, থার্ড টার্মিনালের সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্দেশ্যে লাগানো ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন সাধারণ প্রজাতির চারা গাছের প্রতিটির দাম দেখানো হয়েছে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। অথচ ঢাকা বিমানবন্দরসংলগ্ন সাধারণ নার্সারিগুলোতে এসব একই ধরনের চারা গাছ সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। এই চারা গাছগুলো ক্রয়ের জন্য মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, গাছগুলোর পরিচর্যার ব্যয় বাবদ খরচ হিসাব করা হয়েছে আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া টার্মিনালে একটি নতুন পুকুর নির্মাণের অজুহাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডিসিকে ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তবে স্যাটেলাইট বা গুগল আর্থের আগের চিত্রে দেখা যায়, নির্ধারিত জায়গায় আগে থেকেই একটি স্বাভাবিক জলাশয় বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীতে সেই পুরানো জলাশয়কেই সামান্য পরিমার্জন করে একটি পুকুরের রূপ দিয়ে পুরো টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প এলাকার মাটি অপসারণের কাজেও ঘটেছে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও লঙ্কাকাণ্ড। চুক্তির নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী, উত্তোলিত মাটি প্রকল্প এলাকা থেকে সাড়ে ৬ কিলোমিটার দূরে নিয়ে ফেলার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মাত্র দুই কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেই ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে সেই সাড়ে ৬ কিলোমিটার দূরের পরিবহনের হিসাব ধরেই। কেবল মাটি অপসারণের এই খাতেই মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮৩ কোটি টাকা, যার কারণে সরকারের প্রায় ৫২ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
অডিট রিপোর্টে আরও দেখা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধনের ফিতা কাটার সার্বিক আয়োজনেই খরচ দেখানো হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা, যা মূল চুক্তিতে বা নিয়মমাফিকভাবে একেবারেই ছিল না। এর পাশাপাশি ডিজেল পাম্প সরবরাহে প্রায় ১২ কোটি টাকা, ইউপিএস কেনাকাটা বাবদ সাড়ে ৪৮ কোটি টাকা এবং প্রকল্প এলাকার জন্য জ্বালানি তেল কিনতেই ৪১ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব রাখা হয়েছে। এমনকি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার কথিত যুক্তিতে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ২১৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন)।
আইন ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধি অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ খরচ করার ক্ষমতা থাকলেও, সেই বিধিমালা পুরোপুরি লঙ্ঘন করে সেখানে ২৩ শতাংশ অর্থ খরচ করা হয়েছে। ৬০০টি খাতে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার কেনাকাটা ও বিল পরিশোধের বিপরীতে কোনো যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। প্রকল্পের তদারকির মূল দায়িত্বে ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক অধ্যাপক শামসুল হক। পরিবহন বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ পেলেও তিনি মতামত দিতেন কেনাকাটা ও প্রকিউরমেন্ট নিয়ে। এই অস্বাভাবিক ব্যয় বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অধ্যাপক শামসুল হক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন যে তিনি একা নন, এর সাথে অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন জড়িত ছিল। পরবর্তীতে তিনি নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করেন। অন্যদিকে প্রকল্পের আরেক বিশেষজ্ঞ হারুন-অর-রশিদ অনিয়ম স্বীকার করে জানান, তিনি বিষয়টি আগেই জানতেন এবং ৬০০টি ভ্যারিয়েশন বা সংশোধনীকে সম্পূর্ণ বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছিলেন।
এই সকল ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য সামনে আসার পর ঘটনা ঢাকতে সিভিল এভিয়েশন একটি ডিসপিউট বোর্ড ও অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করে। তবে বিতর্ক তৈরি হয়েছে কারণ যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, তাদেরই কয়েকজনকে এই কমিটিতে রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া ব্যয় করা বিশাল অঙ্কের অর্থ পরবর্তীতে বৈধতা দিতে বিষয়টি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'চিহ্নিত অনিয়মগুলো যদি পোস্ট-ফ্যাক্টো বা ঘটনাউত্তর অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়, তবে তা হবে আরেকটি দুর্নীতির শামিল। এর ফলে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না এবং অনিয়মকে কোনো অবস্থাতেই সেটেলমেন্ট কমিটির মাধ্যমে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।'
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল সাডে ১৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম ও অতিরিক্ত খরচের কারণে সেই ব্যয় বেড়ে গিয়ে বর্তমানে ২২ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করা হলেও দুর্নীতি কোনোভাবেই সমঝোতাযোগ্য নয়। ভুয়া ভ্যারিয়েশন এবং অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত কঠোর তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।