ব্লাড ক্যান্সারের অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়ায় (এএলএল) আক্রান্ত হয়ে মাত্র ১৪ মাস বয়সে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে শিশু আয়মান। শারীরিক জটিলতার কারণে দ্রুত কমে যাচ্ছিল তার শরীরের হিমোগ্লোবিন ও প্লাটিলেট। চিকিৎসকদের জরুরি তাগিদে টানা প্রায় এক মাস ধরে তাকে দিতে হয়েছে প্লাটিলেট ও ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা (এফএফপি)। কিন্তু দীর্ঘ চিকিৎসাকালের পর পুনর্নিরীক্ষায় জানা যায়, এতদিন চিকিৎসায় ব্যবহৃত রক্তের উপাদানের গ্রুপটিই সঠিক ছিল না। 'এ-পজিটিভ' এক শিশুর শরীরে লাগাতার প্রয়োগ করা হয়েছে 'এ-নেগেটিভ' গ্রুপের প্লাটিলেট ও প্লাজমা। রাজধানীর মগবাজারের 'ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক অ্যাফরেসিস অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টার' নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন রক্তের নমুনা ছাড়াই কাল্পনিক ও ভুয়া ক্রসম্যাচিং রিপোর্ট বানিয়ে অর্থ আদায়ের মাধ্যমে এই জীবনঘাতী প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত জুনে। শিশু আয়মানকে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করানো হয়। হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা চাহিদাপত্রে রক্ত বা প্লাটিলেটের গ্রুপ 'এ-নেগেটিভ' লেখা ছিল। সেই চাহিদাপত্র নিয়ে শিশুটির বাবা মামুন হোসেন মগবাজারের উক্ত ব্লাড ব্যাংকে যান। প্রতিষ্ঠানটি প্রথম দিন রক্তের নমুনা নিয়ে 'এ-নেগেটিভ' গ্রুপ শনাক্তের কথা জানায় এবং ডোনারের নমুনার সাথে পরীক্ষা সফল হয়েছে বলে দাবি করে। এরপর ওই ব্লাড ব্যাংক থেকে মোট ১৪ ব্যাগ প্লাটিলেট ও তিন ব্যাগ প্লাজমা কেনেন শিশুর স্বজনেরা। এর মধ্যে দুই ব্যাগ প্লাটিলেট শিশু হাসপাতালে এবং বাকি ১২ ব্যাগ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুর শরীরে দেওয়া হয়।
ধারাবাহিকভাবে প্লাটিলেট সরবরাহ করার পরও আয়মানের শারীরিক অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসছিল না, বা বাড়ছিল না প্লাটিলেটের মাত্রাও। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শে পরীক্ষা করানো হলে ধরা পড়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, পপুলার এবং ঢাকা মেডিকেল—তিনটি পৃথক প্রতিষ্ঠানে পুনরায় রক্তের নমুনা পরীক্ষা করানো হলে নিশ্চিত হওয়া যায় শিশুটির প্রকৃত রক্তের গ্রুপ 'এ-পজিটিভ'। এরপর 'এ-পজিটিভ' প্লাটিলেট দেওয়ার পরই শিশুটির শরীরে প্লাটিলেটের মাত্রা দ্রুত স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিশু হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল উভয় প্রতিষ্ঠানের চাহিদাপত্রে ভুলের সূচনা থাকলেও মগবাজারের ব্লাড ব্যাংকটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে। প্রথম দিনের পর আর কোনো নতুন রক্তের নমুনা সংগ্রহ না করেই কেবল ফোনে অর্ডার নিয়ে প্লাটিলেট তৈরি করা হতো। অথচ প্রতিবারই নমুনা পরীক্ষা, স্ক্রিনিং ও ক্রসম্যাচিং বাবদ ফি আদায় করে ভুয়া 'কম্প্যাটিবল' রিপোর্ট স্বজনদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো। উক্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুল হোসেনও স্বীকার করেন, প্রথম দিনের পর তারা আর নতুন নমুনা গ্রহণ করেননি। তাড়াহুড়োয় ভুল হওয়া এবং হাসপাতালের চাহিদাপত্রের ওপর ভরসা করার দোহাই দেন তিনি।
মাত্র তিনটি ছোট কক্ষ ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হওয়া ওই প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ল্যাব অবকাঠামোর চরম ঘাটতি রয়েছে। ল্যাব পরিচালনায় বিশেষ কোনো যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নাজমুল হোসেন নিজেই এর পরিচালনা ও রক্ত সংগ্রহের কাজ করতেন। ঘটনার পর ভুক্তভোগী বাবা মামুন হোসেন চিকিৎসার চরম অবহেলা ও প্রতারণার অভিযোগ এনে শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে এক কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। বিষয়টি তদন্তে ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে বিদেশ সফর থেকে ফিরেই অভিযুক্ত ব্লাড ব্যাংকের লাইসেন্স বাতিলসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বড় ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।