ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে

২০ জেলায় ডিসি, ১৯১ উপজেলায় ইউএনও

মাঠ প্রশাসনে নারী নেতৃত্বের ঐতিহাসিক মাইলফলক


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২৩ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৭:০০ পিএম

বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার সর্বস্তরে বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ প্রশাসনিক কাঠামোতে নারীদের অংশ গ্রহণ ও জোরালো নেতৃত্ব এক নতুন উচ্চতায় রূপ নিয়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষপদগুলোতে নারী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতি আজ এক ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়েছে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, টেকসই প্রশাসনিক সংস্কার এবং নারীর ক্ষমতায়নের যে চিত্র সামনে আসছে, তাতে দেখা যাচ্ছে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে নারী কর্মকর্তারা নিজেদের দক্ষতা ও সক্ষমতার উজ্জ্বল প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী উচ্চপদগুলোতে নারী কর্মকর্তাদের এই দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ জাতীয় পর্যায়ে ইতিবাচক অগ্রগতির পথকে আরও প্রসারিত করছে।

বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ২০টিতে জেলা প্রশাসক বা ডিসি পদে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন নারী কর্মকর্তারা। এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে মাঠ প্রশাসনে সর্বোচ্চ ১৮ জন নারী কর্মকর্তা একই সাথে জেলা প্রশাসক বা ডিসি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, যা এতদিন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যা হিসেবে নথিভুক্ত ছিল। বর্তমান প্রশাসনিক বাস্তবতায় সেই পূর্ববর্তী রেকর্ড অতিক্রম করে ২০ জন নারী কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের গুরুদায়িত্ব সফলভাবে সামলাচ্ছেন। তবে মাঠ প্রশাসনের বিভাগীয় পর্যায়ের শীর্ষ পদ তথা ৯টি বিভাগীয় কমিশনার পদের কোনোটিতেই এই মুহূর্তে কোনো নারী কর্মকর্তা দায়িত্বে কর্মরত নেই।

জেলা পর্যায়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনকারী নারী জেলা প্রশাসকরা হলেন—ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম, মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নূরমহল আশরাফী, নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া, মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা, কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরিফা হক, রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন, শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম, মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার এবং কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজী আক্তার। এছাড়াও অন্যান্য জেলায় দায়িত্ব সামলাচ্ছেন—রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক, নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন, খুলনার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ, চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার, মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়, বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার, কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ এবং পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোছা. শুকরিয়া পারভীন।

ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বিভাগভিত্তিক হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে নারী জেলা প্রশাসকদের উপস্থিতি ও প্রতিনিধিত্ব অন্য সব বিভাগের চেয়ে শীর্ষে রয়েছে। ঢাকা বিভাগের মোট ১৩টি জেলার মধ্যে ৯টি জেলাতেই শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা অর্থাৎ জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত আছেন নারী কর্মকর্তারা। ভৌগোলিক বিস্তৃতির ভিত্তিতে অন্যান্য বিভাগের মধ্যে খুলনা বিভাগে চারজন, চট্টগ্রাম বিভাগে তিনজন এবং রংপুর বিভাগে দুজন নারী জেলা প্রশাসক রয়েছেন। পাশাপাশি রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগে একজন করে নারী জেলা প্রশাসক মাঠপর্যায়ের প্রশাসন পরিচালনা করছেন।

কেবল জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পদের মধ্যেই নারীদের এই অগ্রগতি সীমাবদ্ধ নয়; বরং উপজেলা প্রশাসনেও নারীদের অংশ গ্রহণ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও আশাব্যঞ্জকভাবে বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট ৪৯৯টি উপজেলার মধ্যে ১৯১টি উপজেলাতেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও পদে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন নারী কর্মকর্তারা। শতকরা হিসাবে দাঁড়ায়—দেশের প্রায় ৩৯ শতাংশ উপজেলায় পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর মূল নেতৃত্ব প্রদান করছেন নারী কর্মকর্তারা।

মাঠপর্যায়ের পাশাপাশি স্থানীয় ভূমি প্রশাসনেও নারী কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিত্ব বেশ সুসংহত ও দৃশ্যমান। বর্তমানে সারা দেশের ৪৭৮ জন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডের মধ্যে ১১৬ জন পদে দায়িত্ব পালন করছেন নারী কর্মকর্তারা। মোট পদের হিসাব বিচারে এটি প্রায় ২৪ শতাংশেরও বেশি। সামগ্রিক বিচারে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ১ হাজার ৮৫টি পদের মধ্যে বর্তমানে ৩৩২টিতে নারী কর্মকর্তারা দক্ষতার সাথে কর্মরত আছেন। এর অর্থ দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশের মাঠ প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পদগুলোর প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ পদে এখন নারীরা শক্ত অবস্থান বজায় রাখছেন।

মাঠ প্রশাসনের পাশাপাশি জাতীয় কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু তথা কেন্দ্রীয় প্রশাসনেও নারীদের উপস্থিতি এবং নীতি নির্ধারণী প্রভাব দিন দিন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাপ্ত উপাত্ত অনুসারে, বর্তমানে সরকারি কাঠামোর ৮১টি সচিব ও সচিব-সমমর্যাদার পদের মধ্যে ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী কর্মকর্তারা নিষ্ঠার সাথে কাজ করছেন। এছাড়া অতিরিক্ত সচিবের ৩৬১টি পদের মধ্যে ৭৩ জন, যুগ্ম সচিবের ১ হাজার ৫১টি পদের মধ্যে ২৪৯ জন, উপসচিবের ১ হাজার ৬৪৩টি পদের মধ্যে ৪০৪ জন এবং সহকারী সচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব পদে থাকা ৩ হাজার ৩৫০ জন কর্মকর্তার মধ্যে ৯৮৬ জন নারী কর্মকর্তা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন।

সব মিলিয়ে সহকারী সচিবের শিক্ষানবিস ও প্রারম্ভিক স্তর থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বোচ্চ সচিব পদমর্যাদা পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ৩৩০টি অনুমোদিত বা সক্রিয় পদের বিপরীতে মোট নারীদের উপস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৮৬ জনে। সার্বিক শতকরা হিসাবে যা দাঁড়ায় প্রায় ২৬.৬৪ শতাংশ। মাঠ প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের এই সম্মিলিত উপাত্ত স্পষ্ট করে যে, সরকারি কর্মক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে নারী কর্মকর্তারা কীভাবে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে এক বিশাল ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিচ্ছেন।



এ সম্পর্কিত আরো খবর